জীবনীমনীষা

ইসলামী শিক্ষার স্বকীয়তা রক্ষায় আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর অবদান

খায়রুল হুদা খান

‘আল উলামা’উ ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া’ -‘উলামায়ে কিরামগণ নবীগণের উত্তরসূরি’ -বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ শাশ্বত বাণীর সত্যায়নে যুগে যুগে এমন কিছু উলামায়ে কিরামের আবির্ভাব ঘটেছে যারা নিজেদের জীবন বাজী রেখে আল্লাহর মনোনীত ধর্মকে পৃথিবীর বুকে প্রচার করেছেন, উম্মতে মুহাম্মদীকে সত্য সঠিক সিরাতুল মুস্তাকীমে পরিচালিত করতে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তেমনি এক মহান ব্যক্তিত্ব হলেন আলেমকুলের শিরোমনি, যুগের মুজাদ্দিদ, রঈসুল কুররা ওয়াল মুফাসসিরীন, উস্তাদুল উলামা ওয়াল মুহাদ্দিসীন, সিলেট তথা বাংলাদেশের গৌরব শামসুল উলামা হযরত আল্লামা মুহাম্মদ আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.)

বিশাল কর্মময় জীবনের অধিকারী আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থে সময়ে সময়ে গড়ে তুলেছেন জাগরণী আন্দোলন, ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ দেখলেই ফেটে পড়েছেন বিক্ষোভে, শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছেন সময়োপযোগী সংগ্রাম। আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর এ সংগ্রামী জীবনের চিত্র তুলে ধরতে গেলেও একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। আজকের এ নিবন্ধে আমি তাঁর জীবনের সমাপনী লগ্নে বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার স্বকীয়তা রক্ষায় তাঁর সফল আন্দোলন ও কথিত ইসলামপন্থী একটি বিশেষ মহলের বিরোধিতা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই।

মাদ্রাসা শিক্ষার সার্বিক মান উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশে একটি ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং মাদরাসার ফাযিল ও কামিলকে ডিগ্রি ও মাস্টার্সের সমমান প্রদানের যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত দাবি ছিল এ দেশের মাদরাসা শিক্ষাদরদী ইসলামপ্রিয় জনতার প্রায় শত বছরের দাবি। কালক্রমে এ দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়। কিন্তু ২০০৬ ইং সনে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকে পাশ কাটিয়ে ফাযিল ও কামিল মাদরাসাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করে ফাযিল ও কামিলকে ডিগ্রি ও মাস্টার্সের মান প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২৪ আগস্ট ২০০৬ ইং তারিখে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকে উপরোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং এ লক্ষ্যে একটি কেবিনেট উপকমিটিও গঠন করা হয়। উক্ত কেবিনেট উপকমিটির এক সভায় মাদরাসা শিক্ষা বিরোধী এক সদস্য মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে প্রতি জেলায় একটি করে মাদরাসা নির্বাচন করে সেগুলোর ফাযিল-কামিলকে ডিগ্রি ও মাস্টার্সের মান প্রদানের জন্য প্রস্তাব করেন। সরকার কর্তৃক গৃহীত এ সিদ্ধান্তে দেশের ওলামা-মাশায়েখদের উপর বিষাদের ছায়া নেমে আসে।

তাঁরা ভাবতে আরম্ভ করলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, ভিসি, প্রো-ভিসি, রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অনেকেরই মাদরাসা শিক্ষা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাদরাসাগুলোকে ন্যস্ত করা হলে মাদরাসাসমূহের স্বকীয়তা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি যেকোন ধর্মের মানুষ হতে পারেন। এখন একজন আলেম মাদরাসায় লেখা-পড়া করে কুরআন-হাদীসের উপর সর্বোচ্চ ডিগ্রি যখন লাভ করবেন তখন তার সার্টিফিকেট ইস্যূ করবেন একজন হিন্দু কিংবা বিধর্মী ব্যক্তি। তদুপরি প্রতি জেলায় একটি করে মাদরাসা নির্বাচন করে মান দেওয়া হলে বাকী মাদরাসাগুলো এমনিতেই দুই এক বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে এবং এতে সীমাহীন কষ্টের মধ্যে পড়বেন এতে চাকুরিরত হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারি আলেম-উলামা। সর্বোপরি যুগে যুগে হক্কানী আলেম-উলামা ও পীর-মাশায়িখ কর্তৃক তিলে তিলে প্রতিষ্ঠিত এ সকল দীনি মারকাযগুলো এভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। এমনি মুহুর্তে মাদরাসা শিক্ষার বিরোদ্ধে এহেন হীন ষড়যন্ত্রের বিরোদ্ধে ফুঁসে উঠলেন আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.)। তিনি এবং তাঁর সংগঠন বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ এ দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়াও সমমনা ছাত্র সংগঠনগুলোকে নিয়ে সর্বদলীয় ইসলামী ছাত্র ঐক্য গঠন করে দাবী আদায়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীন এবং আল্লামা ছাহেব কিবলাহ (রহ.) প্রতিষ্ঠিত আনজুমানে মাদারিছে আরাবিয়াও এক যোগে আন্দোলনে শরীক হয়। ২৮ আগস্ট ২০০৬ ইং তারিখে স্বতন্ত্র ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফাযিল-কামিলকে ডিগ্রী ও মাস্টার্সের মান প্রদানের দাবিতে এবং মাদরাসায় ৩০% মহিলা শিক্ষিকা নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার প্রতিবাদে সিলেট সিটি পয়েন্টে এক মহাসমাবেশের আহবান করে বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ। উক্ত মহাসমাবেশ থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের প্রত্যয় ব্যক্ত করে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৬ ইং তারিখে সিলেট থেকে ঢাকা অভিমুখি লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ’র এই আন্দোলনের সাথে বাংলাদেশের সকল ইসলামী দল ও পীর-মাশায়েখগণ একাত্মতা প্রকাশ করলেও সরকারের শরীক দল জামাতে ইসলামী এর বিরোধিতা করতে থাকে। তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই মাদরাসাকে ন্যস্ত করার জন্য সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। এ সময়ে জামাতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা এবং সরকারদলীয় এমপি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নেতৃত্বে তারা ‘বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা পরিষদ’ নামে একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের জন্ম দিয়ে জেলায় জেলায় সম্মেলনের আয়োজন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাদরাসাগুলোকে ন্যস্ত করার দাবি জানাতে থাকে। সিলেট আলিয়া মাদরাসা ময়দানেও আয়োজন করা হয় সম্মেলনের। আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর আন্দোলনের বিরোধিতা এবং তাঁকে কটাক্ষ করে সাঈদী সাহেব এ সম্মেলনে ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘পীর সাহেব! বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। মাথায় কাজ করে না। লংমার্চ-ঢংমার্চ এগুলোয় কাজ হবে না। ঘরে বসে থাকুন।’

আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর কানে এ খবর পৌঁছানো হলো। তিনি বললেন, ‘যে আমাকে ঘরে বসে থাকার কথা বলে, আল্লাহ তাকেই ঘরে বসিয়ে রাখবেন। আমি রাজপথে থেকেই মৃত্যু বরণ করব।’ বছরের পর বছর ধরে সাঈদী সাহেবের জেলখানার মধ্যে বসে থাকা আল্লাহর ওলীর সাথে বেয়াদবিরই পরিণাম কি না তা ভেবে দেখার বিষয়।

১৫ই সেপ্টেম্বর ২০০৬ ইং মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। সেদিন পাঁচ শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর আহবানে পূণ্যভুমি সিলেট থেকে সকাল ১০ ঘটিকায় রাজধানী অভিমুখে লংমার্চের কাফেলা রওয়ানা হয়। সাথে হাজার হাজার মানুষ। লংমার্চ শেষ হলো জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে এসে, ওভার ব্রিজের তলদেশে। পশ্চিমে পল্টন মোড়, মাঝখানে মঞ্চ, সামনে যতদূর চোখ যায় দৈনিক বাংলার মোড় ছাড়িয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত দু’পাশ ছাপিয়ে লোকে লোকারণ্য। অতি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ছাহেব কিবলাহ (রহ.) বললেন, আমি অনেক কষ্ট করে সুদূর সিলেট থেকে এসেছি একটি কথা বলার জন্যে। আমি প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) কাছে একটি দাবি নিয়ে এসেছি। কোন রাজনৈতিক দাবি নয়। সারা দেশের মাদরাসা শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা, উন্নয়ন ও পরিচর্যার জন্য ঢাকায় একটি ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় চাই। এ দাবি পূরণ করবেন কিনা, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি জানতে চাই। আমি প্রধানমন্ত্রীর জবাবের অপেক্ষায় থাকব।’

সঙ্গত কারণেই প্রশাসনে হৃদকম্পন আরম্ভ হল। বুঝতে পারল আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর মত একজন সিপাহসালার ঝান্ডা হাতে নিয়েছেন। প্রতিক্রিয়া হল সরকারী মহলে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব সিলেটের জনাব হারিছ চৌধুরীকে নিয়োগ করা হলো ছাহেব কিবলাহকে ঢাকায় এনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে বসার এবং এ ব্যাপারে সমঝোতায় উপনীত হওয়ার। প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াত ছাহেব কিবলাহ’র কাছে পৌঁছানো হলো। তিনি অস্বীকার করলেন। খালেদা জিয়ার সাথে বৈঠকে তিনি বসবেন না। অবশেষে দেশের সর্বস্তরের উলামা-মাশায়েখের পীড়াপিড়িতে এবং মাদরাসা শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তিনি রাজী হলেন। সিদ্ধান্ত হল ছাহেব কিবলাহ একাই যাবেন। তবে তাঁকে সহায়তা করার জন্য দু’জন সঙ্গে যাবেন। পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত হলো বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ’র তৎকালীন মহাসচিব, ছাহেব কিবলাহর ছোট ছাহেবজাদা হযরত মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী এবং দৈনিক ইনকিলাবের নির্বাহী সম্পাদক হযরত মাওলানা রূহুল আমীন খান তাঁর সঙ্গে যাবেন। প্রোগ্রাম মত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাঁর কক্ষে হাজির হলেন তিনজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সালাম দিলেন, কুশল বিনিময় হল। ছাহেব কিবলাহ বললেন, ‘জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা আমরা স্মরণ করি। তাঁর জন্য দু’আ করি। আমরা সরকার বিরোধী নই। বিরোধী সরকারের সেই সিদ্ধান্তের, যা ইসলাম বিরোধী, মাদরাসা শিক্ষা বিরোধী।’ প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমরা মাদরাসা শিক্ষার বিরোধী নই; বরং উন্নয়নকামী। ছাহেব কিবলাহ বললেন, অনেক সময় বিষয় না বুঝে উন্নয়ন করতে গেলে তা ধ্বংসের কারণ হয়। যেমন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাদরাসার উচ্চতর দুটি স্তর ফাযিল ও কামিলকে ন্যস্ত করা। মাদরাসা তো সরকার কায়েম করেনি, করেছে এ দেশের পীর-মাশায়েখ ও তাঁদের অনুসারী দীনদার মুসলমানরা। এ ব্যাপারটা তাঁরা ভালো বোঝেন। আপনারা অনুগ্রহ করে তাঁদের বহু কষ্টের সৃষ্ট মাদরাসাগুলোকে স্কুল ও কলেজে পরিণত করবেন না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হলে মাদরাসাগুলো স্কুল-কলেজে পরিণত হবে। ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করুন। আর বাধ্যতামূলকভাবে মাদরাসায় ৩০% মহিলা শিক্ষিকা নিয়োগাদেশ প্রত্যাহার করুন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাদরাসা ন্যস্ত করা হবে না। মহিলা শিক্ষিকা নিয়োগের বাধ্যতামূলক আদেশ শিথিল করা হবে, ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ছাহেব কিবলাহ বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানের খেলাফ করলে তাঁর গযব ডেকে আনা হয়। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন।’

ছাহেব কিবলাহ’র বৈঠকের পরপরই জামাতে ইসলামীর তৎকালীন সেক্রেটারী জেনারেল এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করলেন। জামাতে ইসলামীর বিরোধীতার কারণেই প্রধানমন্ত্রী ছাহেব কিবলাহকে দেয়া তাঁর ওয়াদা থেকে সরে গেলেন। দু’কুল রক্ষার মানসে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার অধীনে ফাযিল ও কামিল শ্রেণীকে ডিগ্রি ও মাস্টার্সের মান প্রদান করা হলো। আল্লামা ছাহেব কিবলাহ (রহ.) কে যখন বিষয়টি জানানো হলো তাঁর চেহারা লাল হয়ে গেল। কেবল বললেন, ‘তখ্ত উল্টে যাবে।’ ওয়ান ইলেভেনের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারে থাকা প্রধানমন্ত্রী, তাঁর পরিবার, মন্ত্রী-সচিবদের অবস্থা কী হয়েছিল তা দেশবাসীর জানা।

তৎকালীন জোট সরকারের এমপি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সম্পাদনায় ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে হজ্জ গাইড প্রকাশ করা হয়। সেখানে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওদ্বা শরীফ যিয়ারতকে নিরুৎসাহিত করে এর পরিবর্তে মসজিদে নববীর যিয়ারতের কথা উল্লেখ করা হয়। আল্লামা ছাহেব কিবলাহ (রহ.) সে সময় সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসা ময়দানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শানে রিসালাত মহাসম্মেলনে দ্ব্যর্থ কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে সঠিক আক্বিদা-বিশ্বাস বিরোধী যে বই প্রকাশ করা হয়েছে, তা অচিরে নিষিদ্ধ করা হোক। সরকারের পেটে কৃমি প্রবেশ করেছে। আমি সরকারকে হুশিয়ার করে দিচ্ছি, অবিলম্বে এই সকল লোকদেরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে না দিলে সরকারের ভবিষ্যত ভয়াবহ হবে।’

অনেক আগের কথা, আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ তখন সিলেট রেল স্টেশন জামে মসজিদে জুমুআ’র নামাজ পড়ান। একদিন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, পীর আবদুল জব্বার সহ জামাআতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা আসলেন তাঁর সাথে দেখা করতে। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের সকল আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখদেরকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম তৈরী করা, ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামে একটি সর্বদলীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা। ছাহেব কিবলাহ (রহ.) সাঈদী সাহেবকে বললেন, আপনি তো সেই সাঈদী সাহেব, যিনি ওয়াজ করেছেন, ‘আল্লাহ নদীকে নির্দেশ দিলেন হে নদী তুমি মুসার জন্য পথ দিয়ে দাও, নদী পথ দিয়ে দিলো এবং মুসা (আ.) দলবল নিয়ে পার হয়ে গেলেন।’ সাঈদী সাহেব বললেন, হুযুর, হাজারটি কথার মধ্যে এক দুটি তো ভুল হতে পারে। ছাহেব কিবলাহ বললেন, তাই বলে কি আল্লাহর কালামের তাফসীর পরিবর্তন করে নবীর মুজিযাকে অস্বীকার করে ফেলবেন? যাই হোক, তাঁদের আগমনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করলে ছাহেব কিবলাহ বললেন, ইত্তেহাদুল উম্মাহ করবেন সেটি ভালো কথা, কিন্তু আপনাদের জামাআতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদী সাহেব এমন কিছু ঈমান বিধ্বংসী আক্বীদার প্রচার করেছেন যেগুলো ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এবং এই ভ্রান্ত আক্বীদায় বিশ্বাসী কোন মানুষের সাথে আমি ইত্তেহাদুল উম্মাহ করতে পারি না। সাঈদী সাহেব জবাব দিলেন, হুযুর আমরা মাওলানা মওদুদী সাহেবের কেবল রাজনৈতিক দর্শনটাকেই গ্রহণ করেছি, তার আক্বীদাকে নয়। তখন ছাহেব কিবলাহ (রহ.) বললেন, ‘এই কথাটা যদি আপনি জনসমক্ষে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন যে আপনারা মাওলানা মওদুদীর আক্বিদার সাথে একমত নন, তাহলে আমাকে আপনাদের সাথে সর্বাগ্রে পাবেন।’ কিন্তু সাঈদী সাহেব একথাটা জনসমক্ষে বলতে পারেননি, কারণ সেটা তো তার শুধু মুখের কথাই ছিল।

সাঈদী সাহেবের বাবা ছিলেন একজন প্রখ্যাত বুযুর্গ এবং ছারছীনার পীর শাহ সূফি নেছার উদ্দিন (রহ.) এর অন্যতম খলিফা। সেক্ষেত্রে বাবার আদর্শ এবং ইশকে রাসূলে তিনি সিক্ত হবেন সেটাই ছিল জাতির প্রত্যাশা। চট্্রগ্রামের লালদিঘী ময়দান এবং সিলেটের সরকারী আলিয়া মাদরাসা ময়দানে নবী প্রেমিক হাজার হাজার জনতাকে নিয়ে তাঁর সুললিত কন্ঠে উর্দূ-বাংলা মিশ্রিত না’তের সাথে ইয়া নাবী সালাম আলাইকা, ইয়া রাসূল সালাম আলাইকার ধ্বনি প্রেমিক হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করত। মিলাদ এবং ক্বিয়ামে রাসূলে পাক (সা.) এর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের মাধ্যমে তিনি হুব্বে রাসূলের বহিঃপ্রকাশ করছেন, চট্রগ্রাম এবং সিলেটের সরলমনা নবীপ্রেমিকদের বিশ্বাস এটাই ছিল। কিন্তু বাস্তবতা সেরকম ছিল না। ১৯৯৫ সালে আমেরিকা সফরে একটি মাহফিলে সাঈদী সাহেবকে মিলাদ-ক্বিয়াম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে, তিনি জবাব দিলেন এটি আল্লাহর রাসূলের যামানায় ছিল না, সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনদের যামানায়ও ছিল না সুতরাং তা বিদ’আত এবং পরিত্যাজ্য। সাথে সাথে তাঁকে প্রশ্ন করা হল, চট্রগ্রামের মাহফিলগুলোতে তিনি কেন মিলাদ-কিয়াম করতেন। জবাব দিলেন, ‘খুব সহজে তাড়াতাড়ি করে কোন এলাকার কাস্টমস এবং ট্রাডিশানকে পরিবর্তন করা যায় না। এই জন্যে কিছু সময়ের জন্য তাদের সাথে একমত থেকে, তাদের মঞ্চে বসে, তাদের মত কাজ করে তাদেরকে বুঝাতে হয়। এখন তারা বুঝে গেছে এবং মিলাদ কিয়াম থেকে বিরত হয়ে গেছে।’

বিষয়টা যদি এরকম হয়, কোন মানুষকে সঠিক পথে আনতে গেলে প্রথমে তার মত হতে হয়, তাহলে কোন মদখোরকে সঠিক পথে আনতে গেলে তার সাথে মদ পান করতে হবে, কোন মুশরিককে হিদায়াত করতে গেলে তার মন জয় করার জন্য তার সাথে শিরক করতে হবে, কোন জুয়াড়ীকে হেদায়াত করতে হলে তার সাথে জুয়া খেলতে হবে……। নাউজুবিল্লাহ!

তাহলে চট্রগ্রামের মাহফিলে ক্বিয়ামে দাঁড়িয়ে তিনি যে বললেন, ‘রাসূলে পাকের শানে সালাত ও সালাম হচ্ছে কেউ হাঁটবেন না। এটা চরম বেয়াদবি। যে যেখানে আছেন সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন। কেউ হাঁটতে থাকলে তাকে থামিয়ে দিন। কারণ এটা বেয়াদবি। রাসূলে পাকের শানে খুব মহব্বতের সাথে সালাত ও সালাম পাঠ করেন। মদীনা মুনাওয়ারায় ফেরেশতারা এ সালাম পৌঁছিয়ে দেবেন। খুব মুহব্বতের সাথে পড়েন ইয়া নাবী সালাম আলাইকা….।’ আধুনিক যামানায় ইউটিউবের মাধ্যমে তাঁর এ সব ভিডিও সাধারণ মুসলমানগণ দেখেন এবং সিলেট ও চট্রগ্রামের সরলমনা নবীপ্রেমিক মানুষদের সাথে তিনি যে ভাওতাবাজি করে নবীপ্রেমিক সেজেছিলেন তার প্রমান দেখে তারা আহত হন। একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলেমের অন্তরের যদি অবস্থা এই হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কাদেরকে বিশ্বাস করবে?

যুক্তরাজ্য সফরে গেলে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের সর্বপ্রথম মসজিদ শাহজালাল মসজিদে ছাহেব কিবলাহ আসতেন প্রত্যেক বছর ওয়াজ করতেন। মসজিদের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম মরহুম আবদুল মতিন সাহেব সহ অনেকেই তাঁর ভক্ত ও মুরিদীন। সাঈদী সাহেবের কিছু ভক্তবৃন্দ চাইলেন তাঁকে শাহজালাল মসজিদে আনবেন। তা নিয়ে মতবিরোধ আরম্ভ হলো। ছাহেব কিবলাহ তখন ম্যানচেস্টারে। তাঁর মুরিদীন-মুহিব্বীনরা চাইলেন তাঁকে নিয়ে মসজিদে মাহফিল করতে। তিনি রাজী হলেন না। বললেন, যেখানে একটা মতবিরোধ হয়ে গেছে সেখানে গিয়ে বিরোধিতাকে উসকে দেওয়া ঠিক নয়। এর পরই ওল্ডহ্যামের একটি মাহফিলে সাঈদী সাহেব সিলেটবাসীকে কটাক্ষ করে কটুবাক্য উচ্চারণ করেন, সিলেটবাসীর কোমল মনে আঘাত করেন। সেই মাহফিলেই তাঁর প্রতি জুতা ছোঁড়া হয়। পুলিশ প্রহরায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়।

যাই হোক, আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর আন্দোলনের ফসল ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবতার মুখ দেখেছে, আলহামদুলিল্লাহ। বাংলাদেশের পীর-মাশায়েখ, আলেম-উলামার শত বছরের প্রাণের দাবি এবং শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর জীবনের শেষ স্বপ্ন ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন হতে চলেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর এ ওলীর দরজাকে বুলন্দ করে দিন এবং তাঁর সকল খিদমতকে কবূল করুন এবং উত্তরোত্তর এ খিদমতগুলোকে সমৃদ্ধ করে দিন। আমিন।

Related Articles