আ’মল

দারুল কিরাতের তিলাওয়াতের স্বকীয়তা থাকবে তো?

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

জকিগঞ্জ স্টুডেন্টস অব সাস্ট এর নবীন বরণে গিয়েছিলাম। ২০১৫ সালের রমযান মাসের বিকেলবেলা। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের শহীদ সুলেমান হলে অনুষ্ঠিত নবীন বরণ ও ইফতার মাহফিলটি ছিল নানা আদর্শ ও দলমতের ছাত্র, শিক্ষক ও অতিথিবৃন্দের মিলনমেলা। অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে কুরআন তিলাওয়াত করেন শাবি তালামীযের অর্থ সম্পাদক হাফিজ ইমরান খাঁন। তিলাওয়াত শেষে মঞ্চের একজন অতিথি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি নিশ্চয় ফুলতলীর কারী? ছোট এই প্রশ্নটি মনে দাগ কাটে। তিলাওয়াত শুনে কি কারী সাহেব চেনা যায়?
এখনও কোন সেমিনারে কোরআন তিলাওয়াত শুনলে একটু খেয়াল করি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুনি ফুলতলীর তিলাওয়াত। আত্মতৃপ্তি বোধ করি। ফুলতলীর কিরাতের রীতি ও শৈলীতে রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। বিশ্বজুড়ে  আছে স্বীকৃতি ও খ্যাতি। অনারব হয়েও আরবদের মতো তিলাওয়াত শিখতে পেরে গর্বিতবোধ করি।
দারুল কিরাতের তাজবীদ শিক্ষা কেবল কোরআন তিলাওয়াত বা আরবি ভাষা পঠনে দক্ষতা তৈরি নয়, ফরাসি ও  জাপনি ফনোলজি শিখনেও সহায়তা করে। দারুল কিরাত পড়ে যারা বিদেশি ভাষা শিক্ষা কোর্স করেন, তারা সহজেই বিদেশি বর্ণের উচ্চারণ শিখতে পারেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুুনিক ভাষাশিক্ষা কোর্সের শিক্ষার্থীরা দারুল কিরাতের মাখরাজ শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হন।
মূল প্রসঙ্গে আসি, দারুল কিরাতের স্বতন্ত্র পঠনরীতি বাতাসে ভর করে উপমহাদেশে আসেনি। যারা জন্য আল্লামা ফুলতলী রহ. তাঁর জীবনের ঘাম, রক্ত, শ্রম, অর্থবিত্ত সবকিছু ব্যয় করেছেন। তিনি তাঁর জীবনে যতগুলো বাতিঘর স্থাপন করেছেন তন্মধ্যে প্রোজ্জ্বল হচ্ছে দারুল কিরাত। বিশ্ব দরবারে ‘ফুলতলী’ নামটি বিকশিত হবার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে দারুল কিরাত। কেবল কিরাতের মাধ্যমেই মাযহাব, মানহায ও সুন্নীয়তের খেদমত চলছে মহাদেশ ছাড়িয়ে। মসজিদ, মক্তব, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, গেরস্তের উঠোন, বাজারের ছাউনি এমনকি গীর্জার আঙ্গিনায় চলছে দারুল কিরাতের কার্যক্রম। শুধু এশিয়া মহাদেশ নয় আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতি বছর দারুল কিরাতের কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বিশুদ্ধ এই আলোর বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে পড়ুক দিগন্তে, এটাই প্রত্যাশা।
আল্লামা ফুলতলী রহ. তাঁর শাগরিদগণকে নছিহত করে গেছেন, “আমি আপনাদের হাতে পবিত্র আমানত সোপর্দ করিলাম, খেয়ানত যেন না হয়।”  এখন মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি এ আমানত রক্ষা করতে পারবো?
কিছু আন্তর্জাতিক কুরআন তিলাওয়াত সংস্থার কল্যাণে নানা রীতি ও শৈলীর কিরাত আমদানি হচ্ছে। বিভিন্ন কিরাত সম্মেলনে মিশরি, ফিলিপিনো বা ইরানি শৈলীর তিলাওয়াত হচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন সুরে কখনো দ্রুত, কখনো শ্লথ, কখনো বা অতিদীর্ঘ স্বর বা আকস্মাৎ ওয়াকফ করার ফলে অতি পরিচিত আয়াতসমূহ হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য। তাতেও আমি বিস্মিত নই। এটাকে কিরাতের বিশ্বায়ন বলা যেতে পারে। কিন্তু ফুলতলীর কারী সাহেবদের কণ্ঠে এসব আধুনিক তিলাওয়াতের ব্যর্থ প্রচেষ্টা আমাকে আহত করে। ‘দারুল কিরাত’ মানদণ্ডের কিরাতের চেয়ে আধুনিক রীতির কিরাতের প্রবণতা বাড়ছে। সরেজমিনে কয়েকটি কিরাত সম্মেলনে গিয়ে দেখা যায়, সাধারণ শ্রোতাবৃন্দ থেমে থেমে দীর্ঘ আওয়াজের তিলাওয়াত শুনতে স্বস্তিবোধ করেন না। কারী সাহেবদের অস্বাভাবিক নড়চড়া ও অযথা সময়ক্ষেপণ আদবের খেলাফ বলে মনে করেন।
সম্প্রতি তালামীযে ইসলামিয়ার একটি কেন্দ্রীয় সম্মেলনে তিনবার তিলাওয়াত শুনার সুযোগ হয়েছিল। তিনটি কিরাতই ছিল আধুনিক রীতির। যা শুনে শুধু উদ্বিগ্ন নয় শঙ্কিত হয়েছি। আল্লামা ফুলতলী রহ. এর মুরীদিন ও মুহিব্বীনের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়ভাজন হলেন তালামীযে ইসলামিয়ার কর্মীগণ। যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ দারুল কিরাতে ছাদিস পাশ ও লতিফিয়া কারী সোসাইটির সদস্য। সেই তালামীযে ইসলামিয়ার কেন্দ্রীয় সম্মেলনে ‘দারুল কিরাত’ মানদণ্ডের তিলাওয়াত যদি না হয়, তবে মুরশিদ কিবলাহর অর্পিত আমানতের রক্ষক হবেন কারা?  শুধু রমযান মাসে শ্রেণিভিত্তিক পাঠদানের মাধ্যমে এটা রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হবার আকাঙ্ক্ষা যাতে দারুল কিরাতের মৌলিকত্ব বিনষ্ট না করে, এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআন শরীফ অবতীর্ণ করেছেন, নিজেই তা রক্ষা করবেন। কিয়ামত পর্যন্ত কুরআন শরীফের হরফ, কালেমা, আয়াত অপরিবর্তিত থাকবে, বিশুদ্ধ কিরাতও কেউ বা কারোর মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকবে। মুমিন মাত্রই এই বিশ্বাস। কিন্তু দারুল কিরাতের সনদধারি কারী সাহেবদের কণ্ঠে যদি আল্লামা ফুলতলী রহ. এর কিরাতের চর্চা না থাকে, তবে আফসোস থেকেই যায়। কিয়ামতের দিন হয়তো এই পবিত্র আমানতের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে কুরআন শরীফের আমানত রক্ষার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক: শিক্ষার্থী, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *