আ’মল

কুরবানীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষা এবং জরুরী মাসাঈল

হযরত মাওলানা আহমদ হাসান চৌধুরী ফুলতলী

আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পবিত্র ত্যাগের স্মৃতির অনুসরণে আমরা প্রত্যেক বছর কুরবানী করি। যাদের কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে তাদের কুরবানী করা ওয়াজিব।

কুরবানীর ইতিহাস
কুরবানীর ইতিহাস সম্পর্কে কুরআন শরীফে এসেছে হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর কাছে নেক সন্তানের জন্য এই বলে দুআ করলেন-
ﺭَﺏِّ ﻫَﺐ ﻟﻰ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼّـٰﻠِﺤﻴﻦَ .
হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর। (আল-কুরআন, সূরা-আস্সাফ্ফাত, আয়াত নং-১০০ )
এই আয়াত থেকে আমরা শিক্ষা পাই আমরা যখন আল্লাহর কাছে সন্তান কামনা করব তখন নেক সন্তান কামনা করব যেভাব ইবরাহীম (আ.) চেয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআ কবূল করলেন, কুরআনে এসেছে-
ﻓَﺒَﺸَّﺮْﻧَـٰﻪُ ﺑِﻐُﻠَـٰﻢٍ ﺣَﻠِﻴﻢٍ .
সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম (আল-কুরআন, প্রাগুক্ত )
আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আ.) কে নেক সন্তান দান করলেন হযরত ইসমাঈল (আ.)। তিনি যখন বাবার সাথে চলা ফেরার উপযুক্ত হলেন তখন ইবরাহীম (আ.) বললেন –
يا ﺑُﻨَﻰَّ ﺇِﻧّﻰ ﺃَﺭﻯٰ ﻓِﻰ ﺍﻟﻤَﻨﺎﻡِ ﺃَﻧّﻰ ﺃَﺫﺑَﺤُﻚَ . ﻓَﺎﻧﻈُﺮ ﻣﺎﺫﺍ ﺗَﺮﻯٰ ۚ
ইব্রাহীম তাকে বললেনঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি। দেখ, এখন তোমার অভিমত কি? (আল-কুরআন, সূরা-আস্সাফ্ফাত, আয়াত নং-১০২)

তাফসীরের কিতাবে এসেছে হয়েছে ইবরাহীম (আ.) যখন তার পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে স্বপ্নের কথা বলেন তখন ইসমাঈল (আ.)-এর বয়স ছিল তের বৎসর। ইবরাহীম (আ.) পরপর তিন দিন এই স্বপ্ন দেখেন।

ইয়াওমুত তারবীয়াহ আরাফাহ ও নহর নামকরণের কারণ
প্রথম দিন স্বপ্ন দেখে ইবরাহীম (আ.) সারাদিন চিন্তা-ভাবনায় কাটিয়ে দেন এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে না শয়তানের পক্ষ থেকে। তাই এটাকে বলা হয় ﻳﻮﻡ ﺍﻟﺘﺮﻭﻳﺔ (দেখা ও চিন্তাভাবনার দিন)। এর পরের রাতেও তিনি একই স্বপ্ন দেখে নিশ্চিত হন যে এটা আল্লাহর পক্ষ হতে। এ দিনকে আমরা আরাফার ﻋﺮﻓﺔ (পরিচয়ের) দিন বলি। তৃতীয় দিন স্বপ্ন দেখে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন এবং কুরবানী ( ﻧﺤﺮ ) করেন। এদিনকে আমরা ﻳﻮﻡ ﺍﻟﻨﺤﺮ বলি। অবশ্য প্রথম দু‘টির নামকরণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যাখ্যাও
বিদ্যমান।

নবীগণের স্বপ্ন অর্থহীন নয়
ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ঠ হয়ে সন্তানকে কুরবানী দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কারণ নবীগণের স্বপ্ন ওহী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে কখনো কখনো স্বপ্নযুগে ওহী নাযিল হতো। রাসূল (সা.) বলেন –
ﺇِﻧَّﺎ ﻣَﻌْﺸَﺮَ ﺍﻷَﻧْﺒِﻴَﺎﺀِ ﺗَﻨَﺎﻡُ ﺃَﻋْﻴُﻨُﻨَﺎ ، ﻭَﻻ ﺗَﻨَﺎﻡُ ﻗُﻠُﻮﺑُﻨَﺎ ( ﺍﻟﻄﺒﻘﺎﺕ ﺍﻟﻜﺒﺮﻯ ﻻﺑﻦ ﺳﻌﺪ
অর্থাৎ: আমরা নবীগণ; আমাদের চোখ ঘুমায় কিন্তু অন্তর ঘুমায় না।

ইসলামে স্বপ্নের গুরুত্ব রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন স্বপ্ন মূল্যহীন। কিন্তু না, মুমিনের স্বপ্নের অর্থ আছে। যদি দ্রষ্টা সত্যবাদী হয়, ওযূর সহিত ঘুমায় আর ভালো সময়ে স্বপ্ন দেখে তাহলে সে স্বপ্নের মূল্য আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- স্বপ্ন হলো নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।

স্বপ্ন তিন প্রকার। একটা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে, আরেকটা হলো নিজের খেয়াল থেকে আর আরেক প্রকার হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে।

পরামর্শ করা নবীগণের আদর্শ
উল্লেখিত আয়াত থেকে আমাদের শিক্ষা হলো আমাদের সন্তানদের উপর কোন কাজ চাপিয়ে না দিয়ে তাদের মতামত গ্রহণ করা, তাদের সাথে পরামর্শ করা উচিত। অনেক সময় দেখা যায় তাদের উপর জোর করে কোন কাজ চাপিয়ে দিলে তারা সেটা করতে চায় না। সে জন্যে ইসলামের আদর্শ হলো তাদের সাথে পরামর্শ করা যেমনটি ইবরাহীম (আ.) তাঁর পুত্রকে বললেন-‘দেখ, এখন তোমার অভিমত কি?’

আল্লাহর জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে
আরেকটি শিক্ষা আমরা পাই, ইসলামের জন্য আমাদের কোন কিছু কুরবানী দিতে হলে আমাদেরকে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। যেভাবে হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর রাহে তার সন্তান কুরবানী করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। তাঁর সুসন্তান হযরত ইসমাঈল (আ.)ও নিজেকে বিলিয়ে দিতে নিবেদিত ছিলেন। তিনি জবাব দিয়েছেন
ﻳَـٰٓﺄَﺑَﺖِ ﭐﻓْﻌَﻞْ ﻣَﺎ ﺗُﺆْﻣَﺮُ ُ ۖ ﺳَﺘَﺠِﺪُﻧﻰ ﺇِﻥ ﺷﺎﺀَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼّـٰﺒِﺮﻳﻦَ .
পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। (আল-কুরআন, প্রাগুক্ত)

আল্লাহর জন্য সব দিতে প্রস্তুত হলে কিছুই হারাতে হবে না
তাফসীরের কিতাবসমূহে পাওয়া যায়, ইবরাহীম (আ.) তার পুত্রের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন কিন্তু গলা কাটছিল না। সে জন্য ইসমাঈল (আ.) তার বাবাকে বলেছিলেন আপনি আমাকে উপুড়/ কাত করে শুইয়ে দিন। হয়তো আপনি ভালোবাসার কারণে ঠিকমতো ছুরি চালাতে পারছেন না। যখন ইবরহীম (আ.) সজোরে ছুরি চালাতে লাগলেন তখন আল্লাহ তাআলা ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে বেহেশতী জন্তু পাঠিয়ে এই বার্তা দিলেন, তোমরা আমার জন্য সব দিতে প্রস্তুত হলে কিছুই হারাতে হবে না। প্রাণ না দিয়েও তা কুরবানীর মর্যাদা লাভ করবে। যেমনটি কুরআনে এসেছে:
ﻓَﻠَﻤّﺎ ﺃَﺳﻠَﻤﺎ ﻭَﺗَﻠَّﻪُ ﻟِﻠﺠَﺒﻴﻦِ ﴿١٠٣﴾ ﻭَﻧـٰﺪَﻳﻨـٰﻪُ ﺃَﻥ ﻳـٰﺈِﺑﺮٰﻫﻴﻢُ ﴿١٠٤﴾ ﻗَﺪ ﺻَﺪَّﻗﺖَ ﺍﻟﺮُّﺀﻳﺎ ۚ ﺇِﻧّﺎ ﻛَﺬٰﻟِﻚَ ﻧَﺠﺰِﻯ ﺍﻟﻤُﺤﺴِﻨﻴﻦَ ﴿١٠٥ ﴾
‘‘যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং ইবরাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করলেন। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।’’ (আল-কুরআন,সূরা-আসসাফ্ফাত, আয়াত নং-১০৩-১০৪)

নরবলি আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়
ইসমাইলের পরিবর্তে জন্তু পাঠিয়ে আল্লাহ এটাও বুঝিয়ে দিলেন, নরবলি তিনি পছন্দ করেন না। পিতাকে দিয়ে পুত্রের গলায় ছুরি চালানোও উদ্দেশ্য নয়। বরং এটা ছিল ইবরাহীম (আ.)-এর জন্য মহান পরীক্ষা। কুরআনে এসেছে-
ﺇِﻥَّ ﻫـٰﺬﺍ ﻟَﻬُﻮَ ﺍﻟﺒَﻠـٰﺆُﺍ۟ ﺍﻟﻤُﺒﻴﻦُ ﴿١٠٦﴾ ﻭَﻓَﺪَﻳﻨـٰﻪُ ﺑِﺬِﺑﺢٍ ﻋَﻈﻴﻢٍ ﴿١٠٧﴾ ﻭَﺗَﺮَﻛﻨﺎ ﻋَﻠَﻴﻪِ ﻓِﻰ ﺍلأﺍﺧِﺮﻳﻦَ ﴿١٠٨﴾ ﺳَﻠـٰﻢٌ ﻋَﻠﻰٰ ﺇِﺑﺮٰﻫﻴﻢَ ﴿١٠٩ ﴾
‘‘নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু। আমি তার জন্যে এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি যে, ইব্রাহীমের প্রতি বর্ষিত হোক সালাম।’’ (আল-কুরআন, সূরা-আস্সাফ্ফাত, আয়াত নং ১০৪-১০৯)

ইবরাহীম (আ.) এর এ কাজ আল্লাহর পছন্দ হয়ে যায়; তাই একাজকে পরবর্তী উম্মতের জন্য স্মৃতিবাহী রীতি হিসাবে চালু করে দেন।

কুরবানীর ইহ ও পরকালীন উপকার
কুরবানীর মাধ্যমে আমরা নিজেকে আল্লাহর রাহে কুরবান হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করি। আমাদের কুপ্রবৃত্তি ও নফসে আম্মারাহ দমনের শিক্ষা নেই। তথাকথিত প্রগতিশীল চিন্তাধারার অনুসারী অনেকে প্রশ্ন করে যে কুরবানীর মাধ্যমে তো কেবল পশুর প্রাণ যায়, মানুষের তো কিছু হয় না। জবাবে বলা যায় কুরবানীর পশু ক্রয় করতে তো আমাদের টাকা খরচ করতে হয়েছে। জন্তু কুরবানীর মাধ্যমে এক বিবেচনায় আমাদের অর্থই কুরবানী হচ্ছে। কুরবানীর দ্বারা আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে লাভবান হই। আমরা আল্লাহর নির্দেশ পালন করি, ইবরাহীম ও আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণের মর্যাদা লাভ করি। পশুর প্রতিটি পশমের পরিমাণ সাওয়াব হাসিল করি। অন্যদিকে কুরবানীর গোশত আমরা নিজেরা খেতে পারি, আত্মীয়স্বজনকে উপহার দিতে পারি এবং অসহায় ও বঞ্চিতদের সাহায্য করতে পারি। কুরবানীর পশুর কেনা-বেচা ও এ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি এনে দেয়। আর সর্বজনবিধিত অর্থকরি দ্রব্য চামড়া রপ্তানীর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিতে গতি আসে।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা
অনেকে আবার পেরেশান হয়ে পড়েন এক সাথে এত পশু নিধনে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায়। আল্লাহর বিধান হলো মানুষ হালাল জন্তুর গোশত ভক্ষন করবে। আর সৃষ্টিকূলের মধ্যেও এ নিয়মই চালু আছে। বাঘ শিয়াল খায়, শিয়াল মোরগ খায়, মোরগ পোকা খায়, আবার পোকা গাছের পাতা খায়। এটাই নিয়ম। এভাবেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা হয়।
কোন প্রাণীর খাদ্য কি হবে সেটা আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এখন আপনি পোকা কে নিষেধ করতে পারবেন না যে তুমি গাছের পাতা খেয়ো না। আল্লাহ আমাদের নির্দেশ করেছেন পশু কুরবানী করতে, তাই আমরা কুরবানী করি।

প্রত্যেক যুগে কুরবানী ছিল
আল্লাহ সকল যুগের কুরবাণীর বিধান দিয়েছেন –
ﻭَﻟِﻜُﻞِّ ﺃُﻣَّﺔٍ ﺟَﻌَﻠﻨﺎ ﻣَﻨﺴَﻜًﺎ ﻟِﻴَﺬﻛُﺮُﻭﺍ ﺍﺳﻢَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻋَﻠﻰٰ ﻣﺎ ﺭَﺯَﻗَﻬُﻢ ﻣِﻦ ﺑَﻬﻴﻤَﺔِ اﻷَﻧﻌـٰﻢِ ۗ
আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। (আল কুরআন ২২:২৩)

কিন্তু মানুষ এটাকে বিকৃতভাবে পালন করতে শুরু করে। পশুকে জবাইর পরিবর্তে নরবলির মত কুপ্রথাও সমাজে চালু হয়। ইসলাম এসব কুসংস্কার রহিত করে সুন্দর পথ উপস্থাপন করেছে। কিন্তু অন্য অনেক ধর্মে পশু বলি দেয়ার পর এটা খাওয়ার বিধান নেই। রক্ত বেদির উপর ছিটিয়ে দেওয়া হয়। জাহেলী যুগে কাবার দেয়ালেও ছিটিয়ে দেয়া হত। কিন্তু আল্লাহ ঘোষণা দেন পশুর গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না বরং আল্লাহ আমাদের অন্তর দেখেন, আমাদের তাকওয়া তার কাছে পৌঁছায়।
ﻟَﻦ ﻳَﻨﺎﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻟُﺤﻮﻣُﻬﺎ ﻭَﻻ ﺩِﻣﺎﺅُﻫﺎ ﻭَﻟـٰﻜِﻦ ﻳَﻨﺎﻟُﻪُ ﺍﻟﺘَّﻘﻮﻯٰ ﻣِﻨﻜُﻢ ۚ
-এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। (আল কুরআন ২২:৩৭)
অন্য আয়াতে এসেছে –
ﺇِﻧَّﻤﺎ ﻳَﺘَﻘَﺒَّﻞُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻤُﺘَّﻘﻴﻦَ .
– আল্লাহ র্ধমভীরুদরে পক্ষ থকেই তাে কেবল গ্রহণ করেন। (আল কুরআন ৫:২৭)

কুরবানীর ফদ্বীলত
কুরবানীর ফদ্বীলতে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। –
ﻗﺎﻝ ﺃﺻﺤﺎﺏ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﺎ ﻫﺬﻩ ﺍﻷﺿﺎﺣﻲ ﻗﺎﻝ ﺳﻨﺔ ﺃﺑﻴﻜﻢ ﺇﺑﺮﺍﻫﻴﻢ ﻗﺎﻟﻮﺍ ﻓﻤﺎ ﻟﻨﺎ ﻓﻴﻬﺎ ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﻗﺎﻝ ﺑﻜﻞ ﺷﻌﺮﺓ ﺣﺴﻨﺔ ﻗﺎﻟﻮﺍ ﻓﺎﻟﺼﻮﻑ ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﻗﺎﻝ ﺑﻜﻞ ﺷﻌﺮﺓ ﻣﻦ ﺍﻟﺼﻮﻑ ﺣﺴﻨﺔ . (ﺳﻨﻦ ﺍﺑﻦ ﻣﺎﺟﻪ , ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻷﺿﺎﺣﻲ : ﺑﺎﺏ ﺛﻮﺍﺏ ﺍﻷﺿﺤﻴﺔ)
– রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ: এই কুরবানী কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আ.)-এর সুন্নত। তাঁরা আবার জানতে চাইলেন, কুরবানীতে আমাদের জন্য কি রয়েছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কুরবানীর পশুর প্রত্যেকটি লোমের পরিবর্তে সওয়াব রয়েছে।

হাদীস শরীফে এসেছে -–
ﺍﺳﺘﻔﺮﻫﻮﺍ ﺿﺤﺎﻳﺎﻛﻢ، ﻓﺈﻧﻬﺎ ﻣﻄﺎﻳﺎﻛﻢ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺼﺮﺍﻁ .
– তোমাদের কুরবানীর পশুগুলোকে সুন্দর ও সাস্থ্যবান কর কেননা এগুলো পুলসিরতে তোমাদের বাহন হবে। (দায়লামী)

কুরবানী না করার ব্যাপারে সতর্কবাণী
যারা নিসাবের মালিক হয়েও কুরবানী করবেন না তাদের ব্যপারে রাসূল (সা.) বলেন –
ﻣﻦ ﻛﺎﻥ ﻟﻪ ﺳﻌﺔ ﻭﻟﻢ ﻳﻀﺢ ﻓﻼ ﻳﻘﺮﺑﻦ ﻣﺼﻼﻧﺎ (ﺳﻨﻦ ﺍﺑﻦ ﻣﺎﺟﻪ , ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻷﺿﺎﺣﻲ , ﺑﺎﺏ ﺍﻷﺿﺎﺣﻲ ﻭﺍﺟﺒﺔ ﻫﻲ ﺃﻡ ﻻ).
– যার সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানী করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।

কুরবানীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাসাঈল

নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক প্রত্যেকের উপর কুরবানী ওয়াজিব
অনেকে মনে করেন গত বৎসর আমার পক্ষ থেকে কুরবানী দিয়েছি এ বৎসর আমার বাবার পক্ষ থেকে অথবা অন্য কারো পক্ষ থেকে দিয়ে দেই। যদি এরকম করেন তাহলে কুরবানী আদায় হবে না। কারণ কুরবানী যার উপর ওয়াজিব তার পক্ষ থেকেই প্রথমত: কুরবানী আদায় করতে হবে। কোন মহিলারও যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে তাহলে তাকেও কুরবানী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যদি এই মহিলার স্বামী স্বতন্ত্রভাবে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন তাহলে তাকেও কুরবানী করতে হবে। এক কুরবানী দু’জনের পক্ষ থেকে আদায় হবে না।

অংশীদারিত্ব ও শর্ত
গরু, মহিষ এবং উট কুরবানীর ক্ষেত্রে এক পশুতে সাত জন অংশিদার হতে পারবেন। শর্ত হলো সাত জনের নিয়ত সহীহ হতে হবে। খালিসভাবে আল্লাহর জন্য কুরবানীর নিয়ত রাখতে হবে। যদি সাত জনের কোন একজনের নিয়তে ভিন্নতা থাকে তাহলে কারো কুরবানী আদায় হবে না। আপনি খাসী, ভেড়া, দুম্বা দিয়েও কুরবানী করতে পারেন। তবে খাসী, ভেড়া, দুম্বা একজনের পক্ষ থেকেই আদায় করতে হবে। এতে অংশিদার হয়ে কুরবানী করা জায়েয নয়।

কুরবানী এবং যাকাতের নেসাবের মধ্যে পার্থক্য
কুরবানী এবং যাকাতের মধ্যে পার্থক্য হলো যাকাতের ক্ষেত্রে নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকা আবশ্যক। কিন্তু কুরবানীর জন্য এক বৎসর থাকা আবশ্যক নয়। যদি কুরবানীর দিনগুলোতেও কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় তাহলেও তাকে কুরবানী করতে হবে।

কুরবানী নিজ হাতে দেওয়া উত্তম
আপনি যদি কুরবানী দিতে সক্ষম হন তাহলে নিজ হাতেই কুরবানী করবেন। আর যদি কুরবানী দিতে না পারেন, তাহলে কুরবানীর সময় কুরবানীর স্থানে উপস্থিত থাকবেন। রাসূল (সা.) হযরত ফাতেমা (রা.) কে কুরবানীর সময় জন্তুর পাশে থাকতে নির্দেশনা দিয়েছেন।

গোশত বন্টন
কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে বন্টন করবেন। একভাগ নিজের জন্য রাখবেন, আরেকভাগ আত্মীয় স্বজনকে দিবেন আর আরেকভাগ গরীব-মিসকীনকে দিবেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন
ﻓَﻜُﻠﻮﺍ ﻣِﻨﻬﺎ ﻭَﺃَﻃﻌِﻤُﻮﺍ ﺍﻟﺒﺎﺋِﺲَ ﺍﻟﻔَﻘﻴﺮَ 
… অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্থকে আহার করাও। (আল-কুরআন: ২২:২৮)

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন – ﻛُﻠُﻮﺍ ﻭَﺗَﺼَﺪَّﻗُﻮﺍ ﻭَﺗَﺰَﻭَّﺩُﻭﺍ ﻭَﺍﺩَّﺧِﺮُﻭﺍ . (ﻣﻮﻃﺄ ﻣﺎﻟﻚ , ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻀﺤﺎﻳﺎ : ﺑﺎﺏ ﺍﺩﺧﺎﺭ ﻟﺤﻮﻡ ﺍﻷﺿﺎﺣي)

চামড়ার ব্যবহার
আরেকটি বিষয় হলো কুরবানীর চামড়া যদি নিজে ব্যবহার করতে পারেন তাহলে করতে পারবেন। আর যদি বিক্রি করেন তাহলে সকল টাকা যাকাতের প্রাপ্য যারা তাদেরকে দিয়ে দিতে হবে। মনে রাখবেন চামড়ার টাকা মসজিদ-মাদরাসা উন্নয়নের জন্য অথবা বেতনের জন্য দেওয়া জায়েয নয়। যদি মাদরাসায় গরীব ফান্ড থাকে তাহলে সেখানে দিতে পারেন কিন্তু আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে এই টাকা মাদরাসার উন্নয়নে অথবা কারো বেতনে ব্যয় হচ্ছে না। অন্যথায় আপনার সদকাহ আদায় হবে না।

আইয়ামে তাশরীক
৯ই যিলহজ্জ ফজর থেকে ১৩ই যিলহজ্জ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব। পুরুষ এবং মহিলা সবাইকে এই তাকবীর পাঠ করতে হবে। জামাআতে নামায হোক অথবা একাকী নামায হোক। তাকবীর একবার বলা ওয়াজিব, তিনবার বলা মুস্তাহাব। মহিলারা আস্তে আস্তে তাকবীর বলবেন। পুরুষের জন্য জোরে জোরে তাকবীর বলা মুস্তাহাব।

তাকবীরে তাশরীক হচ্ছে –
ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ , ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ , ﻻ ﺍﻟﻪ ﺍﻻ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ , ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻛﺒﺮ , ﻭﻟﻠﻪ ﺍﻟﺤﻤﺪ

(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হাম্দ।)

(ঢাকা সুপ্রিমকোর্ট মাযার জামে মসজিদের সম্মানিত খতীব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হযরত মাওলানা আহমাদ হাসান চৌধুরী ফুলতলী এর জুমু’আ বয়ানের অনুলিখন)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *