আ’মলআক্বীদা

কী পেয়েছিলাম, আর কী করেছি!

[আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ রহ.'র তাম্বিয়া কবিতার আলোকে লিখিত]

এক.
কুরআন – হাজার বছরের আরব্য পৌত্তলিকতার বক্ষ চিড়ফাড় করে জাযিরাতুল আরবে তাওহীদের শিখা প্রজ্জ্বলিত করেছিল যে কিতাব।

কুরআন – মরুআরবের দ্বিধাবিভক্ত গোত্রসমূহকে এক উম্মত বানিয়েছিল যে কিতাব। দিয়েছিল জীবনের উদ্দেশ্য। নিরক্ষর আরব জাতিকে বানিয়েছিল দুনিয়ার ইমাম।

কুরআন – যে কিতাব ছিল সায়্যিদুল মুরসালিন ﷺ-এর হেদায়াতের ব্যবহারিক সিলেবাস। দিন কেটেছে এই কুরআনের দাওয়াতে, রাত পার হয়েছে কুরআনের তিলাওয়াতে। সুসংবাদ কুরআনের মাধ্যমে, হুশিয়ারি কুরআনের মাধ্যমে, তাযকিয়া কুরআনের মাধ্যমে, জিহাদ কুরআনের মাধ্যমে। মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম এবং একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব সাধিত হয়েছে এই কুরআনের হাত ধরে। ইহলোক ত্যাগ করার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ এই কুরআনকে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর ‘রূহানী খলিফা’ হিসেবে আমাদের জন্য রেখে গেছেন।

সাহাবিদের ঈমানের উত্তাপ, ইবাদতের প্রশস্ততা, ইলমের গভীরতা, চরিত্রের সৌন্দর্য, ত্যাগ-ধৈর্য-বীরত্ব এবং সর্বোপরি তাঁদের লিল্লাহিয়াত ও হুব্বে রাসূলে ঘেরা জীবন- সবই এই কুরআনের অবদান। এই কুরআন হাতে নিয়ে তাঁরা বিশ্বজয় করেছিলেন। এই কুরআনের মাধ্যমে তাঁরা মানবজাতিকে দিয়েছিলেন নতুন তাহযিব-তামাদ্দুন।

দুই.
আমাদের কাছে কুরআনের পরিচয় একেবারে ভিন্ন। কুরআনের ব্যাপারে আমাদের এতোই শ্রদ্ধা (!) যে, সাহাবিরা যেখানে গাছের ছাল এবং উটের হাড্ডিতে লিখে কুরআন সংরক্ষণ করেছেন, সেখানে আমরা কাগজের উপর কুরআন লিখেও সন্তুষ্ট হইনা। সিল্কের কাপড়ের উপর সোনার সুতো দিয়ে কুরআন লিখি। কোটি টাকা খরচ করে কুরআনের আদলে বিশাল তোরণ নির্মাণ করি। কুরআনের রূহকে ত্যাগ করে আধুনিক শিল্পকলাবিশিষ্ট ‘কুরআন পার্ক’ নিয়ে আঁতলামো করি। ভাগ্যিস আজ উমর রা. আমাদের মাঝে নেই। নইলে তীব্র বেতের বাড়ি থেকে একজনও বাঁচতে পারতাম না।

আজ আমাদের অবস্থা হলো- উমর খৈয়াম, হাফিজ, সিরাজীর ফার্সি কবিতা আমাদের হৃদয়ে উত্তাপ ছড়ায়। কিন্তু কুরআনের আয়াত আমাদের ঈমানে বিন্দুমাত্র নাড়া দিতে পারেনা। রঙচঙে পোশাক পরা আউলা চুলের বাউলা গায়কের নাচের তালে আমাদের (কারো কারো) যিকির চলে। কিন্তু কুরআনের আয়াত নিয়ে মুরাকাবা-মুশাহাদা করার ইচ্ছা ও যোগ্যতা কোনোটিই আমাদের নেই।

এমন নয় যে, আমরা একেবারেই কুরআন পড়িনা। যখন মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে গিয়ে বসি, তখন সুরা ইয়াসিন পাঠ করি। উদ্দেশ্য, যেন ব্যক্তি আরামছে মরে যায়! জীবনদায়ী কিতাবকে আমরা মরণদায়ী কিতাব বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছি।

ফলাফরস্বরূপ, আজ আমরা ঘাসের উপর শিশিরকণার মতো পড়ে আছি। মানুষ আমাদেরকে পা দিয়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে। ভুলেই গেছি যে, আমাদের কাছে এখনও যিন্দা কিতাব পড়ে আছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ জানিয়েছেন, হাশরের মাঠে কুরআন আমাদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে সাক্ষী দেবে। হয় পক্ষে দেবে, নয়তো বিপক্ষে- তবে সাক্ষী অবশ্যই দেবে। যদি সেদিন কুরআন আপনার-আমার বিপক্ষে সাক্ষী দিয়ে দেয়? আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার আর কোনো উপায় থাকবে?

লেখকঃ মারজান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *