আক্বীদা

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ : নবী, রাসূল, উম্মী

হাফিজ মাওলানা মারজান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী

এক.

আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া-তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেনঃ
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِنْهُمْ
“তিনি সেই সত্ত্বা যিনি উম্মীদের মধ্য থেকে তাদের জন্য রাসূল প্রেরণ করেছেন।” [সুরা জুমু’আ : ২]

আরেকটি আয়াতে সফলতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিচয় দেয়া হয়েছে এভাবেঃ
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ
“যারা আনুগত্য করে সেই রাসূলের, যিনি উম্মী নবী।” [সুরা আরাফ : ১৫৭]

পবিত্র কুরআনে একাধিকবার রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উম্মী বলা হয়েছে। একই বিষয় কিছুটা ব্যাখ্যার আকারে উপস্থাপিত হয়েছে অন্য আয়াতে। আল্লাহ বলেছেনঃ
وَمَا كُنتَ تَتْلُو مِن قَبْلِهِ مِن كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ
“আপনি তো এর পূর্বে কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং স্বীয় ডান হাত দ্বারা কোনো কিতাব লিখেননি। এরূপ হলে মিথ্যাবাদীরা অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করত।” [সুরা আনকাবুত : ৪৮]

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেনঃ
كان نبيكم صلى الله عليه وسلم أميا لا يكتب ولا يقرأ ولا يحسب
“তোমাদের নবী ﷺ ছিলেন উম্মী। তিনি লিখতেন না, পড়তেন না, গণনা করতেন না।”
[তাফসির কুরতুবি ; সুরা আনকাবুত : ৪৮]

ইমাম কাতাদাহ ও ইমাম মুজাহিদ একই মত পোষণ করেছেন।
[তাফসির তাবারি ; সুরা আনকাবুত : ৪৮]

ইমাম ইবনে কাসির উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ
قد لبثت في قومك يا محمد من قبل أن تأتي بهذا القرآن عمرا لا تقرأ كتابا ولا تحسن الكتابة، بل كل أحد من قومك وغيرهم يعرف أنك رجل أمي لا تقرأ ولا تكتب
“(আল্লাহর কথার অর্থ হচ্ছে) হে মুহাম্মদ ﷺ, আপনি কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আপনার কউমের নিকট জীবনের বড় অংশ পার করেছেন। আপনি কোনো বই-পুস্তক পড়েননি, লিখেননি। বরং আপনার কউমের এবং বাইরের প্রত্যেক ব্যক্তি জানে যে, আপনি উম্মী। আপনি পড়েন না, লেখেন না।”
[তাফসির ইবনে কাসির ; সুরা আনকাবুত : ৪৮]

দুই.
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া-তা’আলা তাঁর শ্রেষ্ঠ নবী সায়্যিদুনা মুহাম্মদ ﷺ-কে অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দেননি। একইভাবে তিনি তাঁকে কবিতাও শিক্ষা দেননি। কবিদের চারণভূমিতে বসবাস করা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ ﷺ সারা জীবনে একটি পূর্ণ কবিতা রচনা কিংবা আবৃত্তি করেননি। আল্লাহ স্বয়ং এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেনঃ
وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشِّعْرَ وَمَا يَنبَغِي لَهُ
“আমি তাঁকে কবিতা শিক্ষা দেইনি। আর এটি তাঁর জন্য শোভনীয়ও নয়।” [সুরা ইয়াসিন : ৬৯]

রাসূলুল্লাহ ﷺ একবার একটি কবিতা বলতে গিয়ে পঙক্তি এদিক ওদিক করে ফেলেছিলেন। তখন আবু বকর রা. হেসে বলেছিলেনঃ “আমার বিশ্বাস হয়ে গেল যে, আপনি সত্য নবী। কারণ আল্লাহ বলেছেন, তিনি আপনাকে কবিতা শেখাননি।”

রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে লেখনি ও কবিতা শিক্ষা না দেয়ার পেছনে হিকমত হচ্ছে, ‘আল্লাহর কালাম’ হিসেবে পবিত্র কুরআনের অকাট্যতা রক্ষা করা।

কুরআন যখন অবতীর্ণ হয়, তখন আরবি কাব্য-সাহিত্য উন্নতির চূড়ান্ত ধাপে অবস্থান করছিল। অথচ কুরআনের অলংকার ও ভাষাশৈলীর সামনে দাঁড়াতে পারে, এমন কোনো কবি আরবের যমিনে ছিলনা। এমতাবস্থায় কুরআনকে বাতিল করার দুটি উপায় ছিল মুশরিকদের হাতে।

১. হয়তো তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করবে এবং কুরআনকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবে।
২. নয়তো এ দাবী করবে যে, মুহাম্মদ ﷺ নিজে কুরআন লেখে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিচ্ছেন।

প্রথম সম্ভাবনাটি পায়ের তলায় মাটি পায়নি। কারণ মক্কার নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই জানতো, মুহাম্মদ ﷺ কখনও মিথ্যা বলেন না। এরাই তাঁকে আল-আমিন এবং আস-সাদিক উপাধি দিয়েছিল। মুশরিকরা আল্লাহর নবীর ওপর সম্ভাব্য সব নির্যাতন করেছে; কিন্তু তাঁর সততা নিয়ে কখনও প্রশ্ন উঠায়নি।

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিও একইভাবে বাতিল হয়ে গিয়েছিল। কারণ ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বেকার চল্লিশ বছরের দীর্ঘ জীবনে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি বাক্যও লিখেননি। না কেউ তাঁকে পড়তে দেখেছে, না দেখেছে কিছু লিখতে। তথাপি আল্লাহ এ বিষয়টি অবগত করিয়ে দিয়েছেনঃ “আপনি তো এর পূর্বে কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং স্বীয় ডান হাত দ্বারা কোনো কিতাব লিখেননি। এরূপ হলে মিথ্যাবাদীরা অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করত।” [সুরা আনকাবুত : ৪৮]

কুরআনকে বাতিল করার দুটি সম্ভাবনা যখন নিজেই বাতিল হয়ে গেল, তখন মুশরিকরা উপায়ান্তর না দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে যাদুকর, যাদুগ্রস্থ, মৃগীরোগে আক্রান্ত এবং পাগল বলতে শুরু করেছিল। যদিও তারা ভালো করেই জানতো যে, মুহাম্মদ ﷺ যাদুকর নন, যাদুগ্রস্থ নন, মৃগীরোগে আক্রান্ত নন, পাগল নন। সীরাতে ইবনে ইসহাকে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার একটি কথা নকল করা হয়েছে। ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা বলেছেঃ “আমি জানি এটি (কুরআন) কবিতা নয়। মুহাম্মদ কবি নন, যাদুকর নন, পাগল নন। তবুও…।”

রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনও লিখেননি বা আল্লাহ তাঁকে লেখা শিক্ষা দেননি- এ বাক্যটি “কুরআন একটি মানবরচিত গ্রন্থ” নামক সন্দেহকে চিরতরে কবর দিয়ে দিয়েছে। নতুবা মক্কার মুশরিকরা এই অপবাদ আরোপ করতে ক্ষান্ত হতোনা (যেভাবে সুরা আনকাবুতে বলা হয়েছে) এবং আজও মানুষের মনে শয়তান এ কুমন্ত্রণা দেয়ার চেষ্টা করত।

তিন.
প্রশ্ন আসতে পারে, মানবজাতির মহান শিক্ষক মহানবী সায়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ কি জ্ঞানী হওয়ার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত?

জবাব হচ্ছে, অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন না হওয়া মানে অজ্ঞ বা মূর্খ হওয়া নয়। কিংবা কেবল অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হওয়া মানেই জ্ঞানী বা বিজ্ঞ হওয়া নয়। অক্ষর আবিষ্কার হওয়ার পূর্বেও তো এ পৃথিবীতে সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। আর, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আল্লাহ কতটুকু জ্ঞান দান করেছেন, তা আল্লাহ স্বয়ং জানিয়ে দিয়েছেনঃ
وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُن تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
“আমি আপনাকে সে সব বিষয় শিক্ষা দিয়েছি, যা আপনি জানতেন না। আর আপনার ওপর রয়েছে আল্লাহর সুমহান অনুগ্রহ।” [সুরা নিসা : ১১৩]

নিজের জ্ঞানের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে বলেছেনঃ
إِنَّمَا بُعِثْتُ مُعَلِّمًا
“আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।” [সুনান ইবনে মাজাহ ; কিতাবুস সুন্নাহ]

হাদীস সাহিত্যের যে সুবিশাল সংগ্রহ আমাদের কাছে লিখিত আছে, এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জ্ঞানের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন করা কুফরের নামান্তর।

দ্বিতীয়তঃ আমরা জানি যে, মানবজাতির কাছে সংরক্ষিত সবচেয়ে দামী সম্পদ হচ্ছে পবিত্র কুরআন। এই কুরআন অক্ষর/লেখনি আকারে অবতীর্ণ হয়নি। এটি আল্লাহর কালাম বা কথা। কালামে ইলাহি থেকে কালামে জিবরাইল এবং কালামে জিবরাইল থেকে কালামে মুহাম্মদ ﷺ- এভাবেই কুরআন মানবজাতির কাছে পৌঁছেছে। যদি অক্ষর বা লেখনিবিদ্যা মর্যাদার একমাত্র স্মারক হতো, তাহলে কুরআন লেখনি আকারেই অবতীর্ণ হতো; কথা (قَول) আকারে অবতীর্ণ হতোনা।

মূলত, মর্যাদা একটি আপেক্ষিক বিষয়। এটি সবার ক্ষেত্রে সমমানে প্রযোজ্য হয়না। একের জন্য যা মর্যাদাকর, অন্যের জন্য সেটি দূষণীয় হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ- القهار (আল-কাহহার) الجبار (আল-জাব্বার) المتكبر (আল-মুতাকাব্বির) প্রমুখ আল্লাহ সিফাত বা গুণ। কিন্তু মানুষের জন্য এগুলো গুণ তো নয়ই; বরং দূষণীয়।

তাই অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন না হওয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য অমর্যাদাকর নয়। বরং এটি সায়্যিদুল মুরসালিন ﷺ-এর মহান এবং চিরস্থায়ী মু’জিযার মধ্যে অন্যতম। যিনি কখনও একটি বাক্য লিখেননি, তিনি মানবজাতিকে মূর্খতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করে জ্ঞানের আলোর দিকে নিয়ে গেছেন। এমন অনেক বিষয় আছে, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য নির্দিষ্ট এবং মর্যাদাকর। কিন্তু উম্মতের জন্য ওগুলো নিষিদ্ধ। যারা মনে করেন, অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন না হওয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুমহান মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; তাঁরা নিজেদের মর্যাদার ওপর আল্লাহর নবীর মর্যাদাকে কিয়াস করেন। এটি অনুচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অবস্থান বা মর্যাদাকে অন্য কারও মর্যাদার ওপর কিয়াস করা যায়না। আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবকে যে মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছেন, তার উপলব্ধি অন্য কোনো নবী-রাসূলের পক্ষেও সম্ভব নয়।
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ

চার.
যারা উম্মী দ্বারা ভিন্ন অর্থ করেন, তাঁরা প্রমাণ হিসেবে কিছু পত্র উপস্থাপন করেন এবং দাবী করেন যে, এগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিজের হাতে লেখা পত্র। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ কোন পত্র নিজ হাতে লিখেছেন বলে সরাসরি কোন প্রমাণ নেই। সাহাবিদের মধ্যে যারা কাতিব বা লেখক বলে পরিচিত ছিলেন, তাঁরাই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী পত্র লিখতেন। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ পত্রের নিচে সীলমোহর করে দিতেন। একইভাবে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ কাতিব সাহাবিদেরকে নির্দেশনা দিয়ে দিতেন। তাঁরা নির্দেশনা অনুযায়ী আয়াত লিপিবদ্ধ করতেন। যত পত্র, যত সন্ধি, যত চুক্তি, যত ফরমান সবই এভাবে লেখা হয়েছে।

ইমাম ইবনে কাসির সুরা আনকাবুতের ৪৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় নিম্নোক্ত কথা যুক্ত করেছেনঃ
ولا يخط سطرا ولا حرفا بيده بل كان له كتاب يكتبون بين يده الوحي والرسائل إِلى الأقاليم
“তিনি ﷺ একটি বাক্য কিংবা একটি অক্ষরও নিজ হাতে লিখেননি। বরং তাঁর লেখকবৃন্দ ছিলেন, যারা তাঁর সামনে বসে ওহী এবং বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরিত পত্র লিখতেন।” [তাফসির ইবনে কাসির ; সুরা আনকাবুত : ৪৮]

একইভাবে যারা (কাযী আবুল ওয়ালিদ আল-বাজ্জি প্রমুখ) হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ লিখেছিলেন বলে দাবী করেন, তাঁদের দাবী প্রায় সব আকাবির মুহাদ্দিস ও ফুকাহার বিপরীত।

পাঁচ.
রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আল্লাহ কী দিয়েছেন, আর কী দেননি- এই সুক্ষ্ম গবেষণার ওপর আমাদের ঈমান নির্ভর করেনা। এসব আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের একান্ত বিষয়। আমরা আমাদের রবের ওপর সন্তুষ্ট, যেভাবে তিনি আছেন। দীনের ওপর সন্তুষ্ট, যেভাবে আল্লাহ আমাদেরকে দিয়েছেন। নবীর ওপর সন্তুষ্ট, যেভাবে আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন।

رضيت بالله ربا وبالإسلام دينا وبمحمد صلى الله عليه وسلم نبيا ورسولا.

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *