Featuredজীবনীমনীষা

আল্লামা শুয়াইবুর রহমান বালাউটী ছাহেব (রহ.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

শামসুল উলামা হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ) এর অন্যতম খলিফা, জালালপুর জালালীয়া আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ, সিলেটের প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন অধ্যক্ষ মাওলানা শুয়াইবুর রহমান বালাউটি ছাহেব আর নেই। আজ বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর ২০১৯ ইং মোতাবেক ৩ সফর ১৪৪১ হিজরী) বিকাল ৩:৩০ ঘটিকার সময় সিলেটের একটি ক্লিনিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মাওলায়ে হাকীকির ডাকে সাড়া দেন তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আল্লামা শুয়াইবুর রহমান বালাউটী ছাহেব (রহ.) এর জানাযার নামায আগামীকাল শুক্রবার (৪ঠা অক্টোবর ২০১৯) বিকাল ৩ ঘটিকার সময় তাঁর নিজ বাড়ি জকিগঞ্জ উপজেলার রতনগঞ্জ বাজারের দক্ষিণ পাশে (মনসুরপুর গ্রামের পশ্চিমে) হেলি ফিল্ডে অনুষ্ঠিত হবে।

আল্লামা শুয়াইবুর রহমান বালাউটি ছাহেব (রহ.) ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আধ্যাত্মিক জীবন তথা জীবনের সকল পর্যায়েই ছিলেন এক আদর্শের প্রতিকৃতি। তাঁর আদর্শের কারণে হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মুরিদীন-মুহিব্বিন তথা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের হৃদয়ে স্বতন্ত্র আসন করে নিয়েছিলেন তিনি।

সংক্ষিপ্ত জীবনাল্লেখ্যঃ

শিক্ষাজীবনঃ

অধ্যক্ষ মাওলানা মো. শুয়াইবুর রহমান বালাউটি ছাহেব ১৯৪৩ ইংরেজি সালের ১৫ই মে সিলেট জেলাধীন জকিগঞ্জ উপজেলাস্থ ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের বালাউট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর  পিতা মরহুম মো. রছমান আলী এবং মাতা-মোছাম্মাত জয়নব বিবি। ৩ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে দ্বিতীয় অধ্যক্ষ মাওলানা মো. শুয়াইবুর রহমান বালাউটি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন পিতামাতার কাছে। মক্তবে যখন তিনি ‘কায়দা’ শেষ করে ‘আমপারা’ তে সবক নিলেন তখন তাঁর পীর ও মুরশিদ হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ) তাঁকে সড়কের বাজার জয়পুর গ্রামের কুতুব আলী মিয়ার বাড়িতে লজিং করে দিয়ে বললেন, ‘এই ছেলেকে তোমার দায়িত্বে দিয়ে দিলাম। তুমি মাদরাসাতে ভর্তি  করে দেবে।’ সেই বছরই (১৯৪৭ইং) আল্লামা শুয়াইবুর রহমান সড়কের বাজার আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৪৯ ইং সালে বাড়ির নিকটস্থ হাড়িকান্দি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর ইছামতি দারুল উলূম কামিল (এম.এ) মাদরাসা থেকে ১৯৫৬ ইং সালে দাখিল এবং ১৯৫৮ ইং সালে আলিম পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উক্ত মাদরাসা থেকে ১৯৬০ ইং সালে ফাজিল পাশ করে ভর্তি হন সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসায় এবং ১৯৬২ ইং সালে কৃতিত্বের সাথে কামিল উত্তীর্ণ হন।

কর্মজীবনঃ

ছাত্রাবস্থায়ই ১৯৬০ইং সালে তিনি বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ.) মাদরাসায় খন্ডকালীন সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬২ইং সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানেই প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করে কর্মজীবনের সূচনা ঘটিয়ে ১৯৭৫ইং সাল পর্যন্ত দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। ১৯৭৬ইং সাল থেকে ১৯৮২ইং সাল পর্যন্ত আটগ্রাম আমজদিয়া মাদরাসায় প্রধান শিক্ষকের পদে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮২ইং সাল থেকে সিলেট সদরস্থ (বর্তমান দক্ষিণ সুরমা) জালালপুর জালালিয়া কামিল মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ইং সালে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এ কর্মবীর ১৯৯০ইং সালে সিলেট জেলা শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং ১৯৯৩ইং সালে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমী আয়োজিত প্রশিক্ষণে “শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ” সম্মানে ভূষিত হন।

পারিবারিক জীবনঃ

পারিবারিক জীবনে ১১পুত্র ও ২ কন্যা সন্তানের জনক তিনি। পুত্র সন্তানদের ৩জন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যান্যদের মধ্যে ১জন ডাক্তার, ১জন কোরআনে হাফিজ এবং অন্যরা শিক্ষার্জনরত রয়েছেন।

পীর ও মুর্শিদের সান্নিধ্যেঃ

মাওলানা মো. শুয়াইবুর রহমান বালাউটি ছাহেব (রহ.) উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুজুর্গ, শামসুল উলামা হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ). এর কাছ থেকে ১৯৬৭ ইং সনে ইলমে কেরাত এবং ১৯৭১ইং সালে তরিকত বা আধ্যাত্মিক সাধনার সনদ লাভ করেন। হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর কাছে তাঁর বায়আত হওয়ার বর্ণনা তাঁর নিজের ভাষায়ঃ

“আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর দরবারে বায়আতের পূর্বে আমি পীরানে পীর কুতবুল আউলিয়া হযরত আল্লামা শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহ.) এর কাছে বায়আত ছিলাম। বদরপুরী ছাহেব (রহ.) এর ইন্তেকালের কয়েকদিন পূর্বের একটি ঘটনা আমার অন্তঃচক্ষু খুলে দেয়। এ ঘটনাটি হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর অন্যতম কারামত। এ ঘটনা দ্বারা তিনি যে আল্লাহর একজন কামিল ওলী এ বিষয়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায়। ঘটনাটি হচ্ছেঃ আমি মাধ্যমিক শিক্ষা বেশি সংখ্যক গায়ের মসলকী আসাতাযায়ে কিরামের কাছে হাসিল করার কারণে ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর প্রতি আমার বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছিল। দেওয়ানচক গ্রামে লজিং থাকাকালে সে গ্রামের মসজিদের ইমাম মরহুম মাওলানা আবদুছ ছবুর সাহেব রামাদ্বান শরীফে একাকী ইতিকাফে বসতে সম্মত না হওয়ায় গ্রামবাসীর অনুরোধে আমিও তাঁর সাথে ইতিকাফে শামিল হই। একদিন সকালে আমি ‘নূরুল আনওয়ার’ কিতাব পড়ছি এবং তিনি কুরআন শরীফ পড়ছেন, এমতাবস্থায় কথা প্রসঙ্গে তিনি ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর কথা উল্লেখ করলে আমি বললাম, উনি একজন বেদাতী পীর সাব, উনার কথা এখানে আলোচনা করা ঠিক নয়। তিনি অত্যন্ত আশ্চার্যান্বিত হয়ে আর্তনাদের সুরে বললেন, আরে আরে উনার কথা এভাবে বলো না, তিনি একজন কামিল ওলী। উল্লেখ্য, ইমাম ছাহেবও হযরত বদরপুরী (রহ.) এর মুরীদ ছিলেন।

এভাবে কথোপকথনের এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ অকল্পিতভাবে আমরা দু‘জন ঘুমিয়ে পড়ি। অথচ আমার কিতাব এবং তাঁর কুরআন শরীফ তখনো খোলা অবস্থায় ছিল। এটা ঘুম নাকি অজ্ঞান হওয়া ছিল আমরা দু‘জনের কেউই বুঝতে পারিনি। আমি স্বপ্নে দেখলাম, একটি অনাবাদী বাড়ির পুকুরপাড়ে হাত-ছাড়া একটি নতুন চেয়ারে ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) উত্তরমুখী হয়ে বসে আছেন। তাঁর সামনে একটি মাটির স্তুপ। আমার ধারণা হচ্ছে স্তুপের নীচে একটি কূপ আছে এবং হযরত বদরপুরী (রহ.) সেই কূপের ভেতরে ইবলিসকে বন্দী করে রেখেছেন, আর ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) কে এর প্রহরী হিসেবে বসিয়ে রেখেছেন। আমি দেখলাম, কিছুক্ষণ পর পর বন্দী ইবলিসটি মাথা উঠাতে চেষ্টা করলে মাটির স্তুপটিও উপরের দিকে উঠে যায়। তখন ফুলতলী ছাহেব (রহ.) তাঁর চেয়ারের পাশে রক্ষিত কিছু ঢিলা হাতে নিয়ে কুরআন শরীফের একটি আয়াত তিলাওয়াত করা অবস্থায় ইবলিসের উপর ঢিলা নিক্ষেপের জন্য হাত উঁচু করার সাথে সাথে ইবলিসটি মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকে যায়। মনে হলো কুরআন শরীফের আয়াতটি ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে অথচ আওয়াজটি যেন আসমান থেকে আসছে। আর উক্ত আসমানী আওয়াজটি আমার হৃদয়ে এমনভাবে আঘাত করছে যে, আমার মন গলে চোখ দিয়ে পানি ঝরছে আর আমি শব্দ করে কাঁদছি। স্বপ্ন দেখার ঠিক সেই মুহুর্তে ইমাম সাহেব আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে জাগ্রত করে বললেন, এইতো এতো ভালোভাবে কথা বললেন, হঠাৎ কী হলো এতো শব্দ করে কাঁদছেন কেন? উঠে দেখি আমার চোখের পানিতে মসজিদের চাটাই ভিজে মাটির কিছু অংশও ভিজে গেছে।

উক্ত ঘটনার কিছুদিন পর হযরত বদরপুরী (রহ.) ইন্তেকাল করলেন। তাঁকে দাফনের পরের দিন উপস্থিত কিছু মুজায ও মুতাআল্লিকীন বদরপুরী (রহ.) এর খাস কামরায় বৈঠকে বসেন। ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর প্রস্তাবে সকলি একত্রিত থাকার জন্য বদরপুরী ছাহেব (রহ.) এর বড় ছাহেবজাদা আল্লামা মাহমুদুর রহমান ছাহেব (রহ.) এর হাতে উপস্থিত সকলেই বাইয়াত হই। এই সময় মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া স্বপ্নের ঘটনাটি আমার মনে বার বার উদিত হচ্ছিল। হঠাৎ ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর নযর আমার উপড় পড়ল। আমাকে কাছে ডেকে বললেন, তুমি ‘আল্লাহ আল্লায়‘ লেগে যাও। মুরশিদ কিবলাহ (রহ.) এর নেক নযর ও সংস্পর্শ লাভ করা আমার জীবনে আল্লাহ তা‘আলার এক মহা নিয়ামত।”

মাওলানা মো. শুয়াইবুর রহমান বালাউটি ছাহেব (রহ.) একজন ইসলামি দার্শনিক হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। এছাড়া তাঁর প্রতিষ্ঠিত খানকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে করেছে জননন্দিত। তাঁর শিক্ষার্থীবৃন্দ দেশ-বিদেশে উচ্চ পর্যায়ের চাকুরীতে নিয়োজিত থেকে সুনাম কুড়াচ্ছেন। তাঁর রচিত কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর বাগ্মিতা এবং সমাজ ও দেশ হিতৈষী কর্মকাণ্ড তাকে সবার নিকট করেছে প্রশংসিত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সকল খিদমাতকে কবূল করুন এবং তাঁর দরজাহ বুলন্দ করে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *