আ’মল

শবে বরাতঃ বাঙালীর চিরায়ত উৎসব

শেখ ফজলুল করিম মারুফ

(এই দৃষ্টিভঙ্গি একান্ত আমার নিজস্ব। বাঙ্গালী সংস্কৃতি, জীবনাচার ও ইতিহাসের এক বিস্তৃত অধ্যয়ন, অনুধাবন ও অভিজ্ঞতা থেকে আমার এই দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নিয়েছে।

আমি যে ধর্মীয় রাজনৈতিক ও ও সুফিবাদী ধারার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই ও গৌরববোধ করি সেই ধর্মীয় রাজনৈতিক ও সুফিবাদী ধারার মতামত আমি ব্যাখ্যা করছি না। আমি সেই অধিকারও রাখি না। এটা নিছকই আমার মতামত। আমার অনুসৃত ধারার বক্তব্য এর বিপরিত হতে পারে।

এই স্পষ্টীকরণ বক্তব্যের পরেও যদি কেউ এই মতামতের কারণে আমার অনুসৃত ধারাকে সম্পৃক্ত করেন তাহলে তা বিদ্বেষপ্রসূত বলে গণ্য হবে। -লেখক)

শবে বরাত একটি ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রাত। এই রাতের বিশেষ কোন গুরুত্ব আছে কি নেই সেটা নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক তর্কযুদ্ধ আছে।

কিন্তু বাঙ্গালী মুসলমানের কাছে শবে বরাত কেবলই ধর্মের বিষয় না। বাঙ্গালী মুসলমানের কাছে শবে বরাত একটি সামাজিক সংস্কৃতিও বটে। বাঙ্গালীর অন্যসব উৎসবও হয় ধর্মকেন্দ্রিক বা তাতে ধর্মীয় উপসর্গ যুক্ত হয়। শবে বরাত ধর্মকেন্দ্রিক উৎসব। বাঙ্গালীরা এটাকে স্থানিক করেছে এবং এতে আরো কিছু অনুসঙ্গ যোগ করে এটাকে বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে রুপ দিয়েছে।

এইরাতে বাঙ্গালী মুসলমান ঘরে নানা পদের সুস্বাদু হালুয়া-রুটি তৈরি হয় এবং প্রত্যেকে প্রত্যেকের বাড়িতে সেই হালুয়া-রুটি পৌছে দেয়। এটা শুধু হালুয়া-রুটি পৌছানোর ব্যাপার না বরং এর মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতিকে নতুন করে ঝালিয়ে নেয়া হয়। এই হালুয়া-রুটি বিতরনের আরেকটি দিক হলো, গরিব প্রতিবেশির প্রতি সদয়ভাবকে পুনর্জাগরিত করা। এই দিনে সবচেয়ে বেশি হালুয়া-রুটি জমা হয় তার বাসায় যে সেদিন কিছু বানাবে না। এই হাদিয়া পৌছানোও হয় চমৎকার পদ্ধতিতে। বাড়ির বাচ্চারা বিনীতভাবে হাদিয়া নিয়ে প্রতিবেশির বাড়িতে যায়। এর মাধ্যমে বাচ্চাদেরকেও প্রতিবেশির প্রতি সদয় হতে শিখানো হয় এবং বিনীত হতে শেখানো হয়।

এই দিনের আরেকটি সংস্কৃতি হলো, সম্মিলিতভাবে মৃত বাবা-মা, আত্মীয় স্বজন ও মুরুব্বীদের কবর জিয়ারত করা। এর সামাজিক প্রভাব সীমাহীন। পরিবারের মুরব্বিদের প্রতি দ্বায়বোধ তৈরি হয়। পিতা-মাতার প্রতি ও তাদের ঐহিত্যের প্রতি নতুন করে আনুগত্য ঘোষিত হয়। বাচ্চাদের মনে এই কথা গেঁথে যায় যে, বাবা-মা এতোটা গুরুত্বপূর্ণ যে মারা যাওয়ার বহুবছর পরেও তাদের কথা স্বরণ করতে হয় তাদের প্রতি সন্মান দেখাতে হয়। এর কারণে জীবিত বাবা-মায়ের প্রতি তাদের সন্মানবোধ বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত এই কারণেই বাঙ্গালী মুসলিম সমাজে বৃদ্ধাশ্রম সংস্কৃতি গড়ে ওঠে নাই।

এই দিনের আরেকটি কাজ হলো, ঘটা করে বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব ও মুরুব্বীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং প্রত্যেকে প্রত্যেককে ক্ষমা করে দেয়া। এর সামাজিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে যাওয়া বাহুল্য নিশ্চই।

এই দিনে বাড়ির পুরুষরা পরিস্কার জামা-কাপড় পরে বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে মসজিদে যায়। ওয়াজ শোনে, তওবা করে এবং কাজা নামাজ আদায় করে। বাড়ির মহিলারাও কাজ শেষ করে গোছল করে ভালো শাড়ি-পোশাক পড়ে বাড়ির অন্য ছোট মেয়েদের নিয়ে ইবাদতে মগ্ন হয়। পারিবারিক এই ধর্মীয় আবহের কারণেই বাংলাদেশের সমাজে নাস্তিক্যবাদ কখনোই মাথাচাড়া দিতে পারেনি এমনকি পরবর্তী জীবনে নাস্তিক দাবিদার প্রত্যেককে দেখা গেছে অন্তরালে তারা ধর্ম প্রভাবিত।

এই হলো বাঙ্গালী মুসলমানের শবে বরাত সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির ধর্মীয় অনুমোদনের জন্য যদি সালাফের বানী ও কর্মে এর আক্ষরিক উপস্থিতি আশা করেন তাহলে পাবেন না। কারণ সালাফগন বাঙ্গালী ছিলেন না।

বরং এর অনুমোদনের জন্য ইসলামের সার্বজনীনতা ও ইসলামের স্থানিক হওয়ার বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেয়া উচিৎ। ইসলামের চরিত্রও বিবেচনায় নেয়া উচিৎ। ইসলামকে লিখিত কোন সংবিধান বিবেচনা করে প্রত্যেকটা জিনিসকে সেই সংবিধানের ধারা – উপধারায় স্পষ্টভাবে দেখতে চাওয়ার প্রবনতা আইনতাত্ত্বিক প্রবনতা।

ইসলামে যেমন আইনতত্ত্ব আছে তেমনি সমাজতত্ত্ব, সুফিতত্ত্ব, রাষ্ট্রতত্ত্ব, দর্শন ও মানবতাবাদও আছে। মৌলিকভাবে এগুলো একটি আরেকটি দ্বারা সমর্থিত। কিন্তু বাস্তবে যারা এগুলো চর্চা করেন তারা অনেক সময়ই নিজের ধারায় এতো বেশি নিমজ্জিত থাকেন যে, অন্যধারাগুলো তারা বোঝার সময় পান না। তাই ইতিহাসে এই ধারাগুলোর পরস্পর দ্বান্দ্বিক মতামত বিদ্যমান।

এরই ধারাবাহিকতায় বাঙ্গালী মুসলমানের এই শবে বরাত সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও আইনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বক্তব্য আছে।

তারপরেও নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে শবে বরাত হতে পারে একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক ও সামাজিক হাতিয়ার। তাই শবে বরাতের সংস্কৃতির সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক দিক বিবেচনা করে আমি চাই এই সংস্কৃতির বিকাশ ঘটুক। বাঙ্গালী মুসলমানের ঘরে ঘরে উৎসব ছড়িয়ে পড়ুক। শবে বরাত হোক বাঙ্গালী মুসলমানের সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় বন্ধন তৈরির উৎসব।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *