জীবনীমনীষা

ফুলতলী মাদরাসার সুদীর্ঘ চল্লিশ বছরের কর্ণধার আল্লামা নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী

মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান

হযরত আল্লামা মো. নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ) মাদরাসার প্রতিটি কণা-অনুকণায় এবং উন্নয়ন-অগ্রগতির পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর নাম, তাঁর স্মৃতি। তিনি একাধারে দীর্ঘ চল্লিশ বছর মাদরাসার কর্ণধার ছিলেন। নিয়মতান্ত্রিক অবসর গ্রহণের পরও অবৈতনিকভাবে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর মাদরাসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করলেও পাঠদান থেকে অব্যাহতি নেননি। তিনি এখনো দারস-তাদরীসের জন্য আকুল থাকেন। ক্লাসে উপস্থিত ছাত্রসংখ্যা কম না বেশি, সেটি তাঁর কাছে গৌণ বিষয়। তাঁর কাছে মুখ্য বিষয় হলো ইলমে দ্বীনের আলোয় শিক্ষার্থীর মন-মানসিকতাকে আলোকিত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

ইলমে দ্বীনের এ নিবেদিত খাদিম ০১ জুলাই, ১৯৫২ সালে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ফুলতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ, শামসুল উলামা হযরত আল্লামা মো. আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (র.)। আর মাতা মুহতারামা খাদিজা খাতুন কুতবুল আউলিয়া হযরত আবূ ইউসুফ শাহ মুহাম্মদ ইয়াকুব বদরপুরী (র.) এর সুযোগ্যা কন্যা।

শিক্ষা জীবনঃ

পিতৃ ও মাতৃ উভয় দিক থেকে বুযুর্গ পরিবারের ঐতিহ্য বহনকারী আল্লামা নজমুদ্দীন চৌধুরী’র শিক্ষার হাতেখড়ি বুযুর্গ পিতার হাতেই। এরপর তিনি ফুলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করে বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসায় (তৎকালীন বাদেদেওরাইল ইসলামিয়া মাদরাসা) ভর্তি হন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৬২ সনে দাখিল পাশ করেন। এরপর সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা হতে ১৯৬৬ সনে আলিম, ১৯৬৮ সনে ফাযিল এবং মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা হতে ১৯৭০ সনে কামিল পাশ করেন। পরবর্তীতে ঢাকার বুরহান উদ্দীন কলেজ থেকে ১৯৭৫ সনে বিএ পাশ করেন। মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা’য় অধ্যয়নকালে তিনি মাদরাসার তৎকালীন হেড মাওলানা উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলিমে দ্বীন হযরত মাওলানা মুফতী সায়্যিদ আমীমুল ইহসান মুজাদ্দিদী বারাকাতী (র.), হযরত আল্লামা আব্দুর রহমান কাশগরী (র.), হযরত আল্লামা আলাউদ্দীন আল আযহারী (র.) প্রমুখের সান্নিধ্য লাভ করেন।

তাঁর পিতা হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) ইলমে কিরাতে অত্যন্ত সুবিখ্যাত ছিলেন, যিনি তাঁর পীর ও মুরশিদ হযরত আবূ ইউসুফ শাহ মুহাম্মদ ইয়াকুব বদরপুরী (র.) ও প্রখ্যাত কারী হযরত আব্দুর রউফ করমপুরী (র.) এর নিকট থেকে ইলমে কিরাত অর্জন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে মক্কা শরীফ অবস্থান করে তৎকালীন রঈসুল কুররা ও হারাম শরীফের কারীগণের পরীক্ষক হযরত আহমদ হিজাযী মক্কী (র.) এর নিকট ইলমে কিরাতের আরও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করতঃ সনদ লাভ করেছিলেন। আল্লামা মো. নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী স্বীয় পিতার নিকট থেকে পবিত্র কুরআন বিশুদ্ধরূপে তিলাওয়াতের সে শিক্ষা যথাযথভাবে গ্রহণ করেন। এছাড়া সিলেটের বিয়ানীবাজার নিবাসী প্রসিদ্ধ কারী হযরত বশির উদ্দিন কোণাগ্রামী (র.) এর সাহচর্যে অবস্থান করে তিনি তারতীলের সাথে ত্রিশ পারা কুরআন শরীফ শুনিয়ে সনদ লাভ করেন।

জাহিরী ইলম অর্জনের পাশাপাশি তিনি ইলমে বাতিনও অর্জন করেছেন। স্বীয় পিতা হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (র.) এর নিকট থেকে তিনি তাসাওউফের দীক্ষা গ্রহণ এবং খেলাফত লাভ করেন।

কর্মজীবন
হযরত আল্লামা মো. নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী সারাজীবন শিক্ষাদান ও ওয়ায-নসীহতে অতিবাহিত করেছেন। জীবনের সব চাহিদার উপর ইলমে দ্বীনের খিদমাতকে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের প্রথমদিকে তিনি কিছুদিন সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসায় শিক্ষদান করেন। ৫ নভেম্বর, ১৯৭৫ সালে এক ক্রান্তিকালে বাদেদেওরাইল ফুলতলী মাদরাসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যখন প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী ঝড়ে মাদরাসা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। অল্পদিনের মধ্যে তদীয় পিতা হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর বদান্যতা ও তাঁর মুরিদীন-মুহিব্বীনের সহযোগিতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিলুপ্ত মাদরাসাটি পুনর্প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর তিনি মাদরাসার পূর্ব ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার এবং এর সার্বিক উন্নয়নের লক্ষে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর একনিষ্ট প্রচেষ্টায় মাদরাসাটি ১৯৭৭ সনে আলিম, ১৯৮৯ সনে ফাযিল, ১৯৯৪ সনে কামিল (হাদীস) ও ২০০১ সনে কামিল (তাফসীর) স্তরে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীতে মাদরাসার ফাযিল ও কামিলকে যথাক্রমে ডিগ্রি ও মাস্টার্সের মান প্রদানের লক্ষে দেশের সর্বস্তরের আলিম-উলামা, মাদরাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং সর্বশেষ ২০০৬ সালে আল্লামা ফুলতলী (র.) এর লংমার্চের প্রেক্ষিতে সে বছরই মাদরাসার ফাযিল ও কামিল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার অধীভুক্ত হয়। ২০১০ সনে দেশের ৩১টি মাদরাসায় ৪ বছর মেয়াদি ফাযিল অনার্স কোর্স চালু হলে এ মাদরাসাটিতেও অনার্স কোর্স চালু হয়। বর্তমানে এ মাদরাসায় কামিল (মাস্টার্স) এবং কামিল হাদীস ও তাফসীর কোর্স চালু রয়েছে।

আল্লামা মোঃ নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসায় তাঁর কর্মজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাদরাসার প্রধান (প্রথমে সুপারিনটেনডেন্ট এবং পরে ১৯৭৭ সাল থেকে অধ্যক্ষ) হিসেবে অতিবাহিত করেছেন। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি ইলমী খিদমাতে সর্বদা নিয়োজিত ছিলেন। মাদরাসায় কামিল জামাত শুরু হওয়ার পর তিনি বুখারী ও মুসলিম শরীফের পাঠদান করতেন। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণিতে হাদীসে নববীর পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাসসহ অন্যান্য বিষয় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাঠদান করতেন। তিনি সারাজীবন মাদরাসাকে নিজ পরিবারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং মাদরাসার ছাত্রদের নিজ সন্তানের মতো দেখেছেন।
তাঁর মেধা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং স্মৃতিশক্তি খুবই প্রখর। তিনি যখন ইতিহাসের কোনো বিষয় উপস্থাপন করেন তখন মনে হয় যেন সে ঘটনাটি তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। বিভিন্ন ঘটনার সন, তারিখ ও ধারাবাহিকতা নির্ভরযোগ্যযোগ্য বর্ণনার আলোকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারঙ্গম তাঁর মতো ব্যক্তি খুব বেশি পাওয়া দুষ্কর। ৩০ জুন, ২০১২ সালে তাঁর চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে সরকারি অনুমোদনে ১৮ নভেম্বর, ২০১৫ পর্যন্ত তিনি অবৈতনিকভাবে ফুলতলী কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষাদানের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম আগ্রহ তাঁকে সর্বদা মাদরাসার দিকে টানে বিধায় এখনো তিনি মাদরাসার ফাযিল ও কামিল শ্রেণিতে পাঠদান করে থাকেন।

দাওয়াতী জীবনঃ

হযরত আল্লামা নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী মাদরাসায় শিক্ষাদানের পাশাপাশি ওয়ায-নসীহতের মাধ্যমে দ্বীনের খিদমাতে সময় অতিবাহিত করেছেন এবং এখনো এ ধারা অব্যাহত আছে। তাঁর বয়ান সবসময় তথ্যভিত্তিক এবং অত্যন্ত সারগর্ভ ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে থাকে। তিনি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকীদা-বিশ্বাসের প্রামাণ্যতা ও বাতিল মতবাদের অসারতা হৃদয়গ্রাহী ভাষায় উপস্থাপন করে মুসলিম সমাজকে সুপথ প্রদর্শনে নিবেদিত রয়েছেন।

কিরাতের খিদমতঃ

রামাদান মাসে নিজ বাড়িতে তদীয় পিতা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট’ এর ব্যবস্থাপনায় ইলমে কিরাত শিক্ষাদানের যে মহান কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাতে তিনি জীবনের প্রথম দিক থেকেই সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। তিনি একসময় ট্রাস্টের প্রধানকেন্দ্রের নাজিম ছিলেন এবং বর্তমানে ট্রাস্টের সভাপতি। তিনি স্বীয় পিতা রঈসুল কুররা আল্লামা ফুলতলী (র.) এর জীবদ্দশায়ই ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত কিরাত শিক্ষার সর্বোচ্চ শ্রেণি ‘ছাদিছ’ জামাতের সকল ছাত্রকে নিয়ে সম্মিলিত মশক (আম মশক) প্রদান করতেন এবং এখনো প্রদান করেন। ইলমে কিরাতে তাঁকে আল্লামা ফুলতলী (র.) এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।

আল্লামা মোঃ নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী শিক্ষকতাকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বিধায় এর বাইরে লেখালেখি বা অন্য কোনো কাজে তিনি বিশেষ মনযোগী হননি। এ সময়ে তিনি কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন মাত্র। শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের পর কারবালার ঘটনা ও এর পরবর্তী ইতিহাস নিয়ে তিনি একটি তথ্যনির্ভর গবেষণামূলক গ্রন্থ লিখেছেন, যা এখনো প্রকাশিত হয়নি।

পারিবারিক জীবন
পারিবারিক জীবনে তিনি ১৯৭৬ সনে মৌলভীবাজার জেলাধীন রাজনগরের ইটার দেওয়ান পরিবারের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব দেওয়ান আব্দুর রব সাহেবের কন্যা দেওয়ান হাসিনা মোস্তফা এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মহিয়সী এ নারী ১৯৮০ সনে ইন্তেকাল করলে তিনি পরবর্তীতে একই পরিবারের অপর কন্যা দেওয়ান খুজেস্তা-ই মোস্তফা এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

পারিবারিক জীবনে তিনি একজন সফল ব্যক্তিত্ব। তিনি সাত ছেলের জনক, যারা সকলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। তাদের মধ্যে বড় ছেলে মাওলানা মুহাম্মদ হাসান চৌধুরী যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘দারুল হাদীস লাতিফিয়া’র প্রিন্সিপাল। দ্বিতীয় ছেলে মাওলানা আহমদ হাসান চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সুপ্রিম কোর্ট মাযার জামে মসজিদের খতীব। তৃতীয় ছেলে মাওলানা মাহমুদ হাসান চৌধুরী বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ) মাদরাসার আরবী প্রভাষক। চতুর্থ ছেলে মাওলানা মোস্তফা হাসান চৌধুরী স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে গণ-যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে অনার্সসহ মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। অপর তিন ছেলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসায় লেখাপড়া করছেন।

শেষ কথা
আল্লামা মোঃ নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী বর্তমান সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ আলিমে দ্বীন ও শায়খুল হাদীস। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্ত্বাবধানে কয়েক হাজার ছাত্র হাদীসে নববীর জ্ঞান অর্জন করতঃ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইলমে দ্বীনের খিদমতে নিয়োজিত রয়েছেন। আর ইলমে কিরাতে তাঁর কয়েক লক্ষ ছাত্র রয়েছেন যারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে কুরআন মজীদ বিশুদ্ধরূপে তিলাওয়াতের শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেন। তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক ও আদর্শ অভিভাবক। স্বীয় ছাত্র ও সহকর্মীদের প্রতি তিনি অত্যন্ত উদার ও স্নেহপরায়ণ। তিনি অত্যন্ত মিষ্টভাষী, সদালাপী ও হাস্যেজ্জ্বল চেহারার অধিকারী। সামান্য সময়ের একান্ত আলাপে যে কেউ তাঁকে আপন করে নিতে বাধ্য। সুন্নতে রাসূলের অনুসারী ইলমে দ্বীনের একনিষ্ঠ এ খাদিমকে আল্লাহ তাআলা দীর্ঘ ও নেক হায়াত দান করুন। আমীন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *