জীবনী

জ্ঞানবৃক্ষের ছায়াতলে

মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান

বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসা এক বিশাল জ্ঞানবৃক্ষ। এ জ্ঞানবৃক্ষের ছায়াতলে যুগে যুগে আশ্রয় নিয়েছে ইলমে ওহীর সুরা পিয়াসী হাজার হাজার মানুষ। আমারও সৌভাগ্য, আমি এ জ্ঞানবৃক্ষের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। ফুলে-ফলে, পত্র-পল্লবে সুশোভিত, সুঘ্রাণে আকুল করা এ বৃক্ষের ছায়াতলে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মায়ের। আমার লেখাপড়ার হাতেখড়িও মমতাময়ী মায়ের কাছে। শৈশবে মা পরম মমতায় পাশে বসিয়ে ও সস্নেহ শাসনে প্রথমে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরা ও দুআ-কালাম শিক্ষা দেন। একে একে সমস্ত কুরআন শরীফ সবক শুনিয়েছি আম্মাকে। শুধু আমি নই, আমার সমবয়সী বাড়ির সকল চাচাতো-ফুফাতো ভাই-বোন আম্মার কাছেই পড়েছেন। মানুষকে দুআ-কালাম শেখানো, সদুপদেশ দেওয়া, ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা আম্মার সাধারণ অভ্যাস। এখনো তিনি সুযোগ পেলেই ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। অন্যের সহযোগিতায় তিনি সর্বদা নিবেদিতপ্রাণ। কারো কোনো অসুবিধা কিংবা বিপদের কথা শুনলে তিনি পেরেশান হয়ে যান। অনেক সময় আমাদের এমন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন, যা আমাদের সাধ্যের অতীত।

মমতাময়ী মায়ের তত্ত্বাবধানে থেকে থেকে যখন পবিত্র কুরআন শিক্ষা করি তখন সমবয়সীদের সাথে মসজিদের মক্তবেও যাওয়া-আসা শুরু করি। এসময় যেসকল শিক্ষকের স্নেহ-মমতায় সিক্ত হয়েছি তাদের অন্যতম হলেন, জনাব মাওলানা শামসুল হক ও জনাব মাওলানা তাজুল ইসলাম। একই সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠও শুরু হয়। তখন ফুলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জনাব লবিব উদ্দিন চৌধুরী তিনি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। তিনি অত্যন্ত নীতিবান ও নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর ছিলেন। স্কুলে সেসময় শিক্ষক হিসেবে আরো যাদের ভালোবাসা পেয়েছি তারা হলেন, জনাব আতাউল হক চৌধুরী, জনাব হারিছ উদ্দিন খান ও শীলা রানী পাল। জনাব আতাউল হক চৌধুরী স্যার শিক্ষকদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। ছাত্রদের প্রতি ছিলো তাঁর অপত্য স্নেহ। তাই অন্য শিক্ষকদের তুলনায় তিনি ছাত্রদের বেশি ছাড় দিতেন।

আমি যখন ছোট তখন আব্বা আটগ্রাম আমজদিয়া দাখিল মাদরাসায় সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি যথাক্রমে জগন্নাথপুর উপজেলার জয়দা কাঠালখাইড় দাখিল মাদরাসা, বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইরপাড়া সুন্নিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসা এবং নবীগঞ্জ উপজেলার নহরপুর দাখিল মাদরাসায় কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। ফলে বেশিরভাগ সময় তিনি বাড়িতে থাকতেন না। কিন্তু বাড়িতে এলেই ভালো ফলাফলের জন্য উৎসাহ দিতেন। কোনো ভুল পড়লে শুধরে দিতেন। মুখে মুখে নবী-রাসূল ও সফল মানুষদের কাহিনী শুনাতেন। হযরত আদম (আ.) এর সৃষ্টি, জান্নাতে বসবাস ও দুনিয়ায় আগমন, হযরত নূহ (আ.) এর সময়কার প্লাবন, হযরত ইয়াকুব (আ.) এর কান্না, ইউসুফ (আ.) এর হারিয়ে যাওয়া ও পরবর্তীতে রাজত্ব, হযরত ইবরাহীম (আ.) এর কা’বা ঘর নির্মাণ, ইসমাঈল (আ.) এর কুরবানীসহ কুরআন-হাদীসের নানা গল্প আব্বার মুখেই প্রথম শুনেছি। মনে পড়ে বহু রাত এভাবে আব্বার মুখে গল্প শুনে শুনে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি শেষ হলে মাদরাসা না স্কুলে ভর্তি হবো তা নিয়ে দু’টানা শুরু হয়। আমার সমাপনী পরীক্ষার ফল ভালো ছিলো। তাই স্থানীয় জিএমসি একাডেমির একজন শিক্ষক আব্বাকে উদ্বুদ্ধ করেন আমাকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য। সেখানে পড়লে আমি নাকি ডাক্তার হতে পারবো। আব্বা সেই শিক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী আমাকে স্কুলে ভর্তি করতে আগ্রহী। আর আম্মা তাঁর ছেলেকে আলিম বানাবেন। কখনো স্কুলে দিতে তিনি রাজী নন। এমন দু’টানার মুখে প্রথমে আমাকে জিএমসি একাডেমিতে ভর্তি করা হয়। প্রায় তিন মাসের মতো সেখানে ক্লাসও করি। এর মধ্যে আমাকে মাদরাসায় নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা আম্মা চালিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে তিনি সফল হন।

১৯৯১ সালে যেদিন প্রথম ফুলতলী মাদরাসায় ভর্তি হই সেদিন আব্বা আমাকে নিয়ে আসেন তাঁরই একান্ত সুহৃদ ও সহপাঠী মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ মহোদয় হযরত মাওলানা মো. নজমুদ্দীন চৌধুরী মাইজম ছাহেবের কাছে। একান্ত দাবি নিয়ে বলেন, “এ ছেলে আপনার, এর সকল দায়-দায়িত্বও আপনার। আমি তার বিষয়ে আর কিছু জানি না।” তখন মাইজম ছাহেব এক অনাবিল মুচকি হাসিতে আমার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সেদিনের স্মৃতি এখনো আমার চোখে লেগে আছে। হুযূরের অভিভাবকত্বে আমার মাদরাসার প্রথম দিন শুরু হয়েছিলো। আজও তাঁরই অভিভাবকত্বে আমি আছি। হুযূর আমাকে তাঁর সন্তানের মতোই ভালোবাসেন। তাঁর সন্তানরাও আমাকে আপন ভাইয়ের মতো কিংবা তার চেয়েও বেশি মনে করেন। মাদরাসায় অধ্যয়নকালে প্রত্যেক ক্ষেত্রে হুযূর আমার প্রতি স্নেহ-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আমার কর্মজীবনের শুরু থেকে অদ্যাবধি সকল পদক্ষেপে হুযূরের আন্তরিকতা ও ভালোবাসা আমার মাথার উপর প্রশান্তির ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, মাদরাসায় আমরা হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.), হযরত আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী বড় ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী ও হযরত আল্লামা আবদুল জব্বার গোটারগ্রামী (র.) এর মতো বুযুর্গানে কিরামকে পেয়েছি। হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) কে পাওয়া আসলে আমাদের জন্য আল্লাহর এক বিশেষ দয়া। তাঁর বয়সের এমনকি তাঁর খলীফা ও ছাত্রদের অনেককেই আমরা দেখিনি। ছাহেব বাড়ির পাশাপাশি আমাদের বাড়ি হওয়ার সুবাদে শৈশবকাল থেকেই তাঁকে দেখে দেখে আর আব্বার মুখে তাঁর অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব আর মহানুভবতার গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছি। মাদরাসায় ভর্তি হলে প্রতি শনি ও রবিবার তাঁর কিরাত মশক, খতমে খাজেগান ও মুনাজাতে শরীক হওয়ার সৌভাগ্য হয়। প্রত্যেক বছর মাদরাসার আলিম, ফাযিল ও কামিল জামাতের প্রথম সবক প্রদান করতেন হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)। কামিল জামাতে বুখারী শরীফ থেকে আর আলিম ও ফাযিল জামাতে মিশকাত শরীফ থেকে সবক প্রদান করতেন। বেশির ভাগ সময় সবক প্রদান অনুষ্ঠানে মাদরাসার সকল ছাত্র উপস্থিত থাকতেন। এ হিসেবে কৈশোর থেকেই আমরা ছাহেব কিবলাহ (র.) এর দারসে শরীক হওয়ার সুযোগ পাই। কামিল জামাতে হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) বুখারী শরীফের দারস প্রদানকালে আরবী, ফার্সি ও উর্দুর মিশেলে তাকরীর পেশ করতেন। হাদীসের ব্যাখ্যায় দুই হাদীসের মধ্যকার দ্বন্ধ নিরসনে মুহাদ্দিসীনে কিরামের ভাষ্য অনর্গল বলে যেতেন। মতন পাঠে আরবী হরফের শুদ্ধ উচ্চারণের প্রতিও গুরুত্বারোপ করতেন। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর উস্তায হযরত আল্লামা ওয়াজীহ উদ্দিন রামপুরী (র.) এর দারসের স্মৃতিচারণ করতেন। রামপুরী (র.) এর দারসে কেউ আরবী ক্বাফ (ق) হরফকে (ك) এর মতো উচ্চারণ করে ‘কালা কালা রাসূলুল্লাহ (সা.)’ বললে তিনি নাকি রাগ করতেন আর বলতেন, ‘মেরে রাসূল কালে নেহি’ অর্থাৎ আমার রাসূল কালো নন। হাদীস শরীফ পাঠ করতে গেলে প্রতিনিয়ত এ কথাটি মনে হয়।

আমার জীবনের আরেক পরম প্রাপ্তি হলো মুরশিদে বরহক হযরত আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী বড় ছাহেব কিবলাহ ফুলতলীর স্নেহ-ভালোবাসা ও আন্তরিক দুআ। তাঁর মজলিসের শান, শ্রোতাদের মনে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বর্ণনার প্রভাব, তাঁর নিঃস্বার্থ-নির্লোভ মানসিকতা সর্বোপরি তাঁর দারসের বিশেষত্ব ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। হযরত হানযালা (রা.) এর অবস্থা এমন ছিলো যে, তিনি প্রিয়নবী (সা.) এর দরবার থেকে বিদায় নেওয়ার পর পেরেশান হয়ে পড়তেন। এমনি পেরেশানীর মধ্যে তিনি একদিন দরবারে রিসালতে এসে আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! নাফাকা হানযালা অর্থাৎ হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসূল (সা.) বিষয় কী জানতে চাইলে হানযালা (রা.) বলেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার সান্নিধ্যে অবস্থানকালে আপনি বেহেশত, দোযখের কথা আলোচনা করেন। মনে হয় যেন তা চাক্ষুষ দেখছি। আর যখন আপনার দরবার থেকে চলে যাই, আর স্ত্রী, সন্তান, সহায়-সম্পত্তির দিকে মনোনিবেশ করি তখন এসব কথা (আখিরাতের কথা) ভুলে যাই। রাসূলে আকরাম (সা.) এর উত্তরাধিকার এ দুই মহা মনীষী হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) ও হযরত বড় ছাহেব কিবলাহ’র মজলিস থেকে বিদায় নেওয়ার পর ভেতরে ও বাইরে এমন পার্থক্য অনুভূত হয়েছে।

আমি যখন অত্যন্ত ছোট তখন শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল জব্বার গোটারগ্রামী (র.) কে কাছ থেকে দেখেছি। হুযূর আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তিনি আব্বার উস্তায ছিলেন। আমাকে নাতি বলে ডাকতেন। কখনও ‘মাওলানা’, কখনও ‘খান ছাব’ বলেও ডাকতেন। যুহরের নামাযের জন্য যখন বিরতি হতো তখন তিনি আমার হাত ধরে ছাহেব কিবলাহ (র.) এর নতুন বাড়ির পুকুরে নিয়ে যেতেন। সে বাড়িতে তখনও পারিবারিক বসতি শুরু হয়নি। মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ মহোদয় মাইজম ছাহেব প্রায় দিন এসময় গোসল করতেন। গোসল শেষ হলে গোটারগ্রামী হুযূর আমাকে হুযূরের লুঙ্গি গেঞ্জি ধুয়ে দেওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করতেন। কাজ শেষ হলে ওযূ করে হুযূর আমাকে নিয়ে মসজিদে এসে জামাতে শরীক হতেন। ছাত্রদের তিনি হাতেকলমে শিক্ষা দিতেন। একবার আমি ডাস্টার আনা কিংবা অন্য কোনো কাজে অফিসে যাচ্ছিলাম। হুযূর তখন মাদরাসার বারান্দা দিয়ে হাঁটছিলেন। আমি হুযূরকে সালাম করে অফিসের দিকে পা বাড়াই। হুযূর আমাকে ডেকে বলেন, কোনো হুযূরকে তোমার দিকে আসতে দেখলে যেখান থেকে দেখবে সেখানে দাঁড়িয়ে যাবে। হুযূর আসলে সালাম দিবে, তিনি যাওয়ার পর যাবে। এই বলে হুযূর আমাকে দাঁড় করে রেখে পিছনে গেলেন। এরপর তিনি আসলেন, আমি আবার সালাম করলাম। হুযূর আমাকে অতিক্রম করলে আমি অফিসের দিকে গেলাম। প্রিয় মুরশিদ হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) এর প্রতি ছিল তাঁর নিখাদ ভালোবাসা। ইন্তিকালের আগে তিনি সুযোগ পেলেই প্রিয় মুরশিদের সান্নিধ্যে সময় কাটানোর চেষ্টা করতেন। একই দিনে বার বার কদমবুছি করতেন আর বলতেন, এ মুবারক কদমখানা আর কত দিন পাবো? আমরা তখন মনে মনে ভাবতাম, হয়তো ফুলতলী ছাহেব কিবলাহকে আমরা আর বেশিদিন পাবো না এবং এ ভাবনা থেকে কষ্ট অনুভব করতাম। কিন্তু কিছুদিন পর যখন আল্লামা গোটারগ্রামী (র.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন তখন মনে হলো তিনি তাঁর দুনিয়ার জীবন সমাপ্তির ইঙ্গিত পূর্বেই পেয়ে গিয়েছিলেন। দুনিয়া থেকে তাঁর বিদায় মুহূর্তের বাস্তবতা আমাদের এ ধারণাকে আরো শক্তিশালী করেছিল।

মাদরাসায় বিভিন্ন সময়ে আরো পেয়েছি হযরত আল্লামা আবদুল জলিল আটগ্রামী (র.), হযরত আল্লামা মুফতী গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী, হযরত মাওলানা আবদুর রহীম জগন্নাথপুরী (বর্তমান অধ্যক্ষ), হযরত মাওলানা মঈন উদ্দিন রায়বানী, হযরত মাওলানা আফজালুল ইসলাম (কুমিল্লা), হযরত মাওলানা আবদুল জলিল বিয়াবালী, হযরত মাওলানা ফখরুল হাসান গণিপুরী, হযরত মাওলানা জ. উ. ম. আবদুল মুনঈম মঞ্জলালী, হযরত মাওলানা আ. ন. ম. কুতুবুজ্জামান কুলাউড়ী, হযরত মাওলানা ছালেহ আহমদ বেতকোণী, হযরত মাওলানা হবিবুর রহমান রাখালগঞ্জী ও হযরত মাওলানা আশরাফুর রহমান বিশ্বনাথী’র মতো প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ উলামায়ে কিরামকে। এছাড়া আরো যাদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি তাদের মধ্যে রয়েছেন, জনাব এম. এ মালেক খান (আঠারো বাড়ি, ময়মনসিংহ), জনাব মাওলানা মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, জনাব মাওলানা কাজী কাওছার আহমদ, জনাব বেলায়ত হোসাইন, জনাব মাওলানা আবদুল আজিজ আটগ্রামী, জনাব মাওলানা কাজী গোলাম কিবরিয়া, শ্রী শংকর চন্দ্র পাইক, জনাব মোস্তফা কামাল পাশা প্রমুখ।

হযরত মাওলানা আল্লামা আব্দুল জলিল আটগ্রামী হুযূর অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। ব্যস্ত জিন্দেগির অবসরের প্রতিটি মুহূর্ত কিতাব অধ্যয়নে কাটাতেন। অধ্যয়ন ও অধ্যাপনাই ছিল তাঁর একান্ত নেশা। তাঁর কোনো অলসতা ছিলো না। শারীরিক বাধাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, রোগ-শোক-জরাজীর্ণতাকে উপেক্ষা করে শিক্ষাদানই ছিলো তাঁর মূল ব্রত। ছাত্রদের নিয়ে ছিলো তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ছাত্ররা পড়বে, লিখবে, বার বার মুতালাআ করবে, এটাই ছিলো তাঁর প্রত্যাশা। লেখাপড়ার সময় নষ্ট হতে পারে এমন কোনো বিষয় তাঁর চক্ষুশূল ছিলো। ছাত্ররা সভা-সমিতি, মিছিল-মিটিং এ জড়িয়ে সময় নষ্ট করুক এটা তিনি কখনো মেনে নিতে পারতেন না। ঘন ঘন বা দীর্ঘমেয়াদি ছুটির প্রতি তাঁর ছিলো অনীহা। তিনি মনে খুবই আঘাত পেতেন যখন শুনতেন মাদরাসা কয়েক দিন বা সপ্তাহ দুয়েকের জন্য বন্ধ। তাঁর কথা ছিলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন এরূপ বন্ধ হবে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি এতো বন্ধ হয় তবে ছাত্ররা পড়বে কখন?

সকল ছাত্রের প্রতিই তাঁর ভালো ফলের আশা ছিলো। তবে বোধ হয় আমার প্রতি ছিলো তাঁর একটু বেশি প্রত্যাশা। তাঁর কামনা ছিলো আমি যেন মেধা তালিকায় স্থান লাভ করি। দাখিল পরীক্ষায় আমার ফলাফল মোটামুটি ভালো হলেও তা হুযূরের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। তাই হুযূর বলে দিলেন আমি আলিম পরীক্ষায় যেন মেধা তালিকায় স্থান লাভ করি। হুযূরের সে আশা তাঁরই দুআতে পূরণ হয়েছিলো, কিন্তু তিনি তাঁর জীবদ্দশায় স্বীয় আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি। আমাদের আলিম পরীক্ষা চলাকালে তিনি ইন্তিকাল করেন।

মুফতী ছাহেব হযরত আল্লামা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ছাহেব এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। ফুলতলী মাদরাসা ও এর শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী নির্বিশেষে সকলের প্রতি তাঁর হৃদয়ে রয়েছে এক অকৃত্রিম ভালোবাসা। মাদরাসার প্রতি সর্বদা তিনি অত্যন্ত আন্তরিক। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতেন। অনেক সময় নিজের বেতনের টাকা বা তার অংশবিশেষ মাদরাসায় দান করে দিতেন। কখনো গরীব ছাত্রদের পাঞ্জাবি ও ছাত্রীদের বোরকা কিনে দিতেন। এখনো মাদরাসা ও ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি তাঁর সে আন্তরিকতা অক্ষুন্ন রয়েছে। মাদরাসার শিক্ষকবৃন্দেরও তিনি হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন। তাদের নিজ ঘরে নিয়ে আপ্যায়ন করতে পারলে পরম তৃপ্তি অনুভব করেন। তাদের সাথে উঠাবসা ও সময় কাটানোতে তিনি অন্যরকম পুলক অনুভব করেন।

জনাব মাওলানা আব্দুর রহীম জগন্নাথপুরী হুযূর (বর্তমান অধ্যক্ষ মহোদয়) ক্লাস নিতেন কম। মাদরাসার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তিনি মাইজম ছাহেবের সাথে ছায়ার মতো থাকতেন। বলতে গেলে মাইজম ছাহেবের সকল চিন্তা-চেতনা ও পরিকল্পনা তাঁর ত্যাগ ও পরিশ্রমে বাস্তবায়িত হতো। পাঠদানে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। যে বিষয় পড়াতেন তা যেন ছাত্রদের মনে গেঁথে দিতেন। আলিম জামাতে তিনি মাঝে মাঝে আমাদের ফারাইয পড়াতেন। ফারাইযের মতো কঠিন বিষয়ও তখন সহজ মনে হতো।

হযরত মাওলানা মঈন উদ্দিন রায়বানী হুযূর আদব-কায়দা ও নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। হুযূরকে খুব বেশি ভয় পেতাম। ক্লাসে ছাত্রদের বসার ক্ষেত্রে হুযূর আদবের প্রতি খুব খেয়াল রাখতেন। ডেস্ক বা বইয়ের উপর হাত রাখতে নিষেধ করতেন। বেঞ্চে বসে সামনের দিকে পা দিতেও বারণ করতেন। বলতেন, এভাবে পা রাখা মানে তো উস্তাযের দিকে পা ছড়িয়ে দেওয়া। ইমাম আবূ হানীফা (র.) তো তাঁর উস্তাযের বাড়ির দিকে পা দিয়ে ঘুমাতেন না।

হযরত মাওলানা আ. ন. ম. কুতুবুজ্জামান কুলাউড়ী হুযূর অত্যন্ত খোলামনের মানুষ ছিলেন। সকলের সাথে মিশতেন অবলীলায়। পড়াতেনও সহজ ভাষায় সহজ করে। কোনো প্রশ্ন নিয়ে হুযূরের কাছে গেলে তৎক্ষণাৎ উত্তর বলে দিতেন। কোনো বিষয়ে জানা না থাকলে সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে বলতেন, এ বিষয় আমার জানা নেই।

হযরত মাওলানা জ. উ. ম. আবদুল মুনঈম মঞ্জলালী হুযূরকে আমরা সদা হাস্যোজ্জ্বল দেখেছি। ১৯৯৭ সালে মাদরাসা ছাত্র সংসদের উদ্যোগে ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল। এতে একটি পার্ট ছিল ‘জাতীয় সংসদ অধিবেশন’। হুযূর তখন স্পিকারের ভূমিকায় ছিলেন। সত্যিই তখন হুযূরকে স্পিকারের মতো লাগছিলো। সে বছর আমি দাখিল পরীক্ষায় স্টার মার্কস পেয়ে পাশ করেছিলাম। তাই পড়ালেখা বিষয়ে এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমি প্রথম সাক্ষাতকারের মুখোমুখি হই। হুযূর সাক্ষাতকারের জন্য যথাযথ নির্দেশনা আমাকে আগে প্রদান করেছিলেন।

হযরত মাওলানা আশরাফুর রহমান বিশ্বনাথী হুযূর নীতি-নৈতিকতার প্রতি জোর দিতেন, সুন্নাহ অনুসরণের প্রতি তাকীদ দিতেন। বিশেষত পায়জামা-পাঞ্জাবি ও দাড়ি-টুপির প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করতেন। আমি যখন আলিম প্রথম বর্ষে পড়ি হুযূর মুখে হাত দিয়ে দাড়ি না কামানোর জন্য বলেছিলেন। হুযূরের সে কথা আমি রেখেছি আলহামদুলিল্লাহ।

হযরত মাওলানা হবিবুর রহমান রাখালগঞ্জী হুযূর আমাদের আরবী, ইংরেজি, বাংলা, উসূল, হাদীস সব বিষয়ে ক্লাস নিয়েছেন। সকল বিষয়ে তিনি সমান পারদর্শী। এখনো কোনো বিষয়ে কোনো খটকা লাগলে হুযূরের দ্বারস্থ হই।

হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল বিয়াবালী হুযূর একজন আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ। তিনি জীবনের সুস্থাবস্থার অধিকাংশ সময় ইবাদত-বন্দেগীতে কাটিয়েছেন। নামায, রোযা, ইবাদত-বন্দেগী ও শরীয়তসম্মত জীবন যাপন হলো তার জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। তিনি কোনোভাবে কারো মনে আঘাত দিতেন না। তিনি কাউকে গালি দিয়েছেন বা কষ্ট দিয়েছেন এমন কথা জীবনেও শুনিনি। তিনি সারাজীবন ফুলতলী কামিল মাদরাসায় দারস দিয়েছেন। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ, সহকর্মী ও শিক্ষার্থী সকলের নিকট তিনি অত্যন্ত সমাদৃত। এওলাসার জামে সমজিদে একাধারে দীর্ঘ পঁচিশ বছর তিনি ইমামতি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মহল্লাবাসী মুসল্লীদের কোনো অভিযোগ ছিল না। সে গ্রামের মানুষের ভাষ্য, তিনি একজন ফেরেশতা। আসলেই বিয়াবালী হুযূর একজন মানবরূপী ফেরেশতা। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেন। সকলের জন্য আন্তরিক কল্যাণ কামনা করেন। কোনো মানুষকে নিয়ে কোনো বিরূপ সমালোচনা তাঁর মুখে কেউ শুনেনি। একদা তিনি বাজারে কেনাকাটা করতে গেছেন। এক দোকান থেকে কিছু সামগ্রী কেনার পর টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে দেখেন তাঁর পকেট খালি। তখন দোকানদারকে বললেন, ভাই, আমার থেকে অন্য একজনের প্রয়োজন হয়তো বেশি। তাই তিনি টাকা নিয়ে গেছেন। ব্যাগটা রেখে দেন। আমি অন্য সময় নেব। দোকানদার তো হতভম্ভ। তিনি চোর বা পকেটমারকে গালিগালাজ তো করছেনই না, বরং সম্মানসূচক ‘তিনি’ শব্দ ব্যবহার করছেন!

বিয়াবালী হুযূর বারো মাস ছাতা ব্যবহার করতেন। এর একটি কারণ রোদ কিংবা বৃষ্টি থেকে বাঁচা। অন্য আরো একটি কারণ ছিল চোখকে হেফাযত করা। আগে গ্রামের রাস্তা ছোট ছিল। রাস্তায় কোনো মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি ছাতা দিয়ে নিজেকে আড়াল করে নিতেন। অনেক সময় নিজে রাস্তা থেকে নেমে মহিলাদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলে যাওয়ার পথ করে দিতেন। হুযূরের সাথে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক। তিনি সম্পর্কে আমার নানা হন। আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা যাওয়া করতেন। আমাদের ঘরে এমনকি এওলাসার ও সিরাজপুর গ্রামের প্রত্যেক ঘরে বিয়াবালী হুযূর ছাড়া কোনো শিরনী বা দুআ মাহফিল অকল্পনীয় ছিল। তাকওয়ার গুণে ভূষিত সর্বজনশ্রদ্ধেয় এ মনীষী এখন অসুস্থ। আল্লাহ যেন তাঁর এ প্রিয় বান্দা নেক হায়াত ও শিফায়ে কামিলা দান করেন। আমীন।

হযরত মাওলানা ফখরুল হাসান গণিপুরী হুযূর ছাত্র সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন। তিনি সর্বদা ছাত্রদের চলা-ফেরা ও আচার-আচরণে নৈতিকতার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। কারো মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখলে সুকৌশলে সুন্দর ভাষায় শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। প্রয়োজনে শাস্তিও দিতেন। প্রতিনিয়ত আমাদের উত্তম উপদেশ আর বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আদর্শ মানুষ হবার শিক্ষা ও প্রেরণা দিতেন। সেই শৈশবে পঞ্চম শ্রেণিতে সরকারি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য হুযূর আমাদের নিয়ে সিলেট গিয়েছিলেন। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা ছিলো পরীক্ষা কেন্দ্র। বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার মতো প্রস্তুতি তখন আমাদের কারো ছিলো না। তদুপরি হুযূর আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন কেবল সাহসী করে তোলার জন্য। আমার হাতের লেখা সুন্দর করার পেছনেও হুযূরের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। আমাদের সময়ে পরীক্ষার হলে ছাত্রদের মধ্যে নকল করার প্রবণতা ছিলো। দাখিল পরীক্ষার আগে কিছুদিন হুযূর আমাকে তাঁর কামরায় ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, “তোমার যে মেধা আছে তুমি ইনশাআল্লাহ ভালো ফল করতে পারবে। যদি তুমি নকল করে পাশ করো তাহলে ফল ভালো করলেও নিজের মনে একটি অপরাধবোধ থাকবে। আর নিজ থেকে লিখে ফল যদি তুলনামূলক খারাপও হয় তবু নিজের মধ্যে একটা আত্মতৃপ্তি কাজ করবে।” হুযূরের এ উপদেশ আমার সারাজীবনের জন্য এক অন্যতম পাথেয়। দাখিল পরীক্ষায় আমি গণিতে পনেরো মার্কসের উত্তর দিতে পারিনি। অন্যের দেখে কিংবা নকল করে লেখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হুযূরের সে উপদেশ আমাকে অসদুপায় অবলম্বন থেকে বাঁচিয়েছিলো।

হযরত মাওলানা ছালেহ আহমদ বেতকোণী হুযূর আব্বার সাথে অত্যন্ত সুসম্পর্ক রাখতেন। শুধু বেতকোণী হুযূর নয়, মাদরাসার সকল শিক্ষকের সাথেই আব্বার সুসম্পর্ক ছিলো। মাদরাসার একাধিক শিক্ষক আব্বার ছাত্র ছিলেন। জনাব মাওলানা মোস্তাক আহমদ চৌধুরী কান্দিগ্রামী হুযূর ছাত্রদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ছাত্রদের সকল সুবিধা-অসুবিধায় তিনি এগিয়ে আসতেন। মাদরাসার প্রতি তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। জনাব মাওলানা কাজী কাওছার আহমদ কলাকুটার হুযূর দীর্ঘদিন ছাত্রাবাসের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ক্লাস নিতেন।

ছাত্রজীবনে ফুলতলী মাদরাসার প্রত্যেক শিক্ষক আমাকে তাদের স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন। মাদরাসায় ভর্তির পর প্রথম বছর যাদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি তারা হলেন জনাব মাওলানা আবদুল খালিক পুকরার হুযূর, জনাব মাওলানা লুৎফুর রহমান পরচকী হুযূর, জনাব মাওলানা আবদুল মান্নান বাল্লাহর হুযূর, জনাব কারী আবদুর রশিদ নান্দিশ্রীর হুযূর, জনাব কারী আবদুল মান্নান চৌধুরী মৌগ্রামী হুযূর, জনাব মাস্টার আবদুল খালিক (নান্দিশ্রী), জনাব মাস্টার শিহাব উদ্দিন চৌধুরী (মনসুরপুর) ও জনাব মাস্টার আবদুল গণি (ময়মনসিংহ)।

জনাব মাওলানা আবদুল খালিক পুকরার হুযূর আমাদের আরবী পড়াতেন। তাঁর আন্তরিকতা ও কঠোরতা এখনো স্মৃতিতে ভাসে। পরচকী হুযূর, গণিপুরী হুযূর ও আটগ্রামী ছানী হুযূর (জনাব মাওলানা আবদুল আজিজ) আমাদের সরফ-নাহু শিক্ষাদানে অত্যন্ত পরিশ্রম করেছেন। আমার আরবী শেখার ভীত তাদের হাত ধরেই রচিত হয়েছে। আর গণিত ও ইংরেজির ভীত রচিত হয়েছে শ্রী শংকর চন্দ্র পাইক স্যারের হাত ধরে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিক্ষক আমাদের গণিত ও ইংরেজি পড়িয়েছেন। আমাদের ইবতেদায়ী ও দাখিল স্তরে গণিত, ইংরেজি ও বাংলার শিক্ষকগণ ঘন ঘন পরিবর্তন হয়েছেন। তাদের অনেকের নামও জানিনি বা মনে রাখতে পারিনি। বাবু স্যার (শ্রী শংকর চন্দ্র পাইক) দীর্ঘদিন মাদরাসায় ছিলেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ছাত্রদের শিক্ষাদানের চেষ্টা করতেন। তিনি আমার প্রতি বিশেষ নজর রাখতেন। আমি দাখিল পরীক্ষায় গণিতে পঁচাশি মার্কসের উত্তর প্রদান করে পঁচাশিই পেয়েছি। আমি মনে করি এটি স্যারের চেষ্টার ফল।

ময়মনসিংহের স্যার জনাব মো. আব্দুল গণি ছাত্র শিক্ষক সকলের সাথে সমান ভাব রাখতেন। ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে তিনি আমাদের বিজ্ঞান পড়াতেন। একবার মাদরাসা বোর্ড থেকে একজন পরিদর্শক ক্লাস পরিদর্শনে এসেছিলেন। তখন আমাদের বিজ্ঞানের ক্লাস ছিলো। তিনি প্রশ্ন করলেন, রেডিও আবিষ্কারক কে? উত্তরটা জানা ছিল। কিন্তু কেনো যেন বলতে পারছিলাম না। স্যার তখন পরিদর্শকের পিছনে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কনুই উঠানামা শুরু করলেন। তখন আমি বললাম, মার্কনি (উল্লেখ্য, সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কনুইকে ‘কনি’ বলা হয়)। সেদিনের কথা এখনো খুব মনে পড়ে।

স্মৃতিতে আরো কত কথা ভাসে। কিন্তু সব কথা কি আর লেখা যায়? আর কলেবর তো ইতোমধ্যে বেড়েই গেছে। একসময় এ মাদরাসার ছাত্র ছিলাম, এখন শিক্ষক। এটাও তো আমার জন্য এক বড় প্রাপ্তি, আমার প্রতি শ্রদ্ধেয় আসাতিযায়ে কিরামের ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন। মনে পড়ে, আমি যখন কামিল পরীক্ষা দেই তখন তৎকালীন অধ্যক্ষ হযরত মাইজম ছাহেব হুযূর আমাকে একান্তে কাছে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নেওয়ার আগে যেন তাঁকে জানাই। ২০০৩ সালের শেষ অথবা ২০০৪ সালের প্রথমদিকে সোবহানীঘাটস্থ হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসায় আরবী প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। তখন আমি এমসি কলেজে অধ্যয়নের পাশাপাশি সোবহানীঘাট মাদরাসার কিন্ডারগার্টেন শাখায় সময় দিতাম। সে সময় একদিন সোবহানীঘাট মাদরাসার তৎকালীন উপাধ্যক্ষ জনাব মাওলানা হোসাইন আহমদ সাহেবের মাধ্যমে মাদরাসার অধ্যক্ষ জনাব মাওলানা কমরুদ্দীন চৌধুরী ছাহেব আমাকে বাসায় ডেকে নেন। আমি প্রভাষক পদে আবেদন করবো কি না জানতে চান। আমাদের শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ মহোদয় মাইজম ছাহেবের কথা তখন মনে পড়ে। ফলে আমি তাঁকে পরে জানাবো বলে বিদায় নিয়ে আসি। ফুলতলী এসে মাইজম ছাহেবকে এ বিষয়ে অবগত করলে তিনি তৎকালীন উপাধ্যক্ষ মহোদয় জনাব মাওলানা আবদুর রহীম জগন্নাথপুরী হুযূরের সাথে কথা বলে জানান, “শীঘ্রই আমরা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছি। তুমি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে আবেদন করবে না।” হুযূরের নির্দেশমতো আমি অন্য কোথাও আবেদন করিনি। মাদরাসার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে আমি আবেদন করি। নির্ধারিত তারিখে নিয়োগ পরীক্ষায় পাশ করে ২০০৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আমি ফুলতলী মাদরাসায় আরবী প্রভাষক হিসাবে যোগদান করি। আমার ছাত্রজীবনের শুরু হয়েছিল মাইজম ছাহেবের স্নেহ ছায়ায়, কর্মজীবনও শুরু হলো তাঁর অধীনে, তাঁরই একান্ত ভালোবাসায়। আল্লাহ যেন হুযূরকে আমাদের মাথার ছায়া হিসেবে দীর্ঘদিন বাকী রাখেন।

আমাদের আসাতিযায়ে কিরামের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আল্লাহ যেন তাঁদের জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করেন আর যারা জীবিত আছেন তাঁদের যেন সুস্থ রাখেন এই দুআ করি।

[বি.দ্র: স্মারকের মূল লেখায় একজন সম্মানিত শিক্ষকের নাম বাদ পড়েছিল এবং দুজন সম্মানিত শিক্ষকের নাম ভুল হয়েছিল। এখানে তা সংশোধন করা হয়েছে। অনিচ্ছাকৃতভাবে বা খেয়ালের ভুলে আর কোনো শিক্ষকের নাম বাদ পড়ে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।]

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *