জীবনীমনীষা

নিভৃতচারী আলিমে দ্বীন মাওলানা মোহাম্মদ আবদুছ ছালাম খান (র.)

হযরত মাওলানা আবদুছ ছালাম খান (র.) একজন নিভৃতচারী আলিমে দ্বীন ছিলেন। তিনি নিরবে-নিভৃতে বহু মসজিদ-মাদরাসার খিদমত করেছেন। সাদাসিধে জীবনের অধিকারী মাওলানা মোহাম্মদ আবদুছ ছালাম খান জকিগঞ্জ উপজেলার ৯নং মানিকপুর ইউনিয়নের সিরাজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম তারিখ ০১ ডিসেম্বর ১৯৫২ ঈসায়ী। তাঁর পিতা কারী ইমতিয়াজ আলী খান একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সারা জীবন মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আমৃত্যু এ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আর মাতা তছলিমুন্নেছা ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণী ও নেককার মহিলা।

মাওলানা আবদুছ ছালাম খান পারিবারিক পরিবেশে পিতার তত্ত্ববাবধানে দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা অর্জন করেন। তিনি ১৯৬২ সালে বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসা থেকে দাখিল পাশ করেন। তখন মাদরাসার নাম ছিলো বাদেদেওরাইল ইসলামিয়া মাদরাসা। এরপর তিনি ইছামতি দারুল উলূম কামিল মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৬৮ সনে আলিম ও ১৯৭২ সনে ফাযিল পাশ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি দৌলতগঞ্জ গাজীমুড়া কামিল মাদরাসা কুমিল্লা থেকে হাদীস বিভাগে কামিল পাশ করেন। ইলমে হাদীসে তিনি সময়ের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও বুযুর্গ, শামসুল উলামা হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) ও হযরত আল্লামা হবিবুর রহমান (মুহাদ্দিস ছাহেব, রারাই) এর সরাসরি ছাত্র হবার গৌরব অর্জন করেন এবং তাঁদের নিকট থেকে সনদ লাভ করেন। কৈশোরেই ১৯৬৫ সালে তিনি হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) এর নিকট থেকে ইলমে কিরাত শিক্ষালাভ করেন এবং পরবর্তীতে সনদও লাভ করেন। তিনি হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) এর একান্ত মুরীদ ও প্রিয়ভাজন ছাত্র ছিলেন এবং ছাহেব কিবলাহ (র.) এর নির্দেশনার আলোকেই তাঁর কর্মজীবন পরিচালনা করেছেন। তিনি ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) এর সুযোগ্য ছাহেবজাদা হযরত আল্লামা নজমুদ্দীন চৌধুরী ছাহেবের সহপাঠী ছিলেন। আমৃত্যু তাঁর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিলো। তাছাড়া ছাহেব বাড়ির সকলের প্রতিই তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক ও ভালোবাসা ছিলো।

তিনি কর্মজীবনের প্রথমদিকে কিছুদিন বাড়ন্তি দাখিল মাদরাসায় শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৯ সালের ১ জুন ফুলতলী মাদরাসায় সহকারি মৌলভী পদে যোগদান করে ১৯৮৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এখানে কর্মরত ছিলেন। এরপর হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) এর নির্দেশক্রমে আটগ্রাম আমজদিয়া দাখিল মাদরাসায় সুপারিনটেনডেন্ট পদে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৩ সালের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি সেখানে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। এরপর পর্যায়ক্রমে জয়দা আরাবিয়া দাখিল মাদরাসায় ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৯৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এবং চান্দাইরপাড়া সুন্নিয়া হাফিযিয়া দাখিল মাদরাসায় ১৯৯৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০০০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৩ সালের রামাদ্বান মাসে অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি নবীগঞ্জ নহরপুর দাখিল মাদরাসায় সুপারিনটেনডেন্ট পদে কর্মরত ছিলেন।

কর্মজীবনে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যেসকল মাদরাসায় সুপার পদে কর্মরত ছিলেন সে প্রতিষ্ঠানগুলো তার হাত ধরেই ক্রমোন্নতি লাভ করেছে। তিনি বিজ্ঞ আলিমে দ্বীন ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের নিকট ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। তিনি ফিকহ ও ফারাইয শাস্ত্রে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে ফাতওয়া প্রদান করতেন।

পারিবারিক জীবনে ১৯৭২ সালে তিনি নিয়াগুল নিবাসী বিশিষ্ট আলিমে দ্বীন মাওলানা আবদুস সাত্তার (র.) এর কনিষ্ঠা কন্যা মোছা. নারগিছ বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এ তরফে তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তারা হলেন, মাওলানা নজমুল হুদা খান, মাওলানা খায়রুল হুদা খান, আরিফা খান ও হাফিয মাওলানা মো. আমিনুল হুদা খান। এরপর তিনি সিরাজপুর নিবাসী মরহুম আবদুল হক চৌধুরীর বড় কন্যা ফারহানা বেগম চৌধুরীর সাথে দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এ তরফে তার তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। তারা হলেন, শাহীদা খান, মো. সিরাজুল হুদা খান, হামিদা খান, মো. মিজানুল হুদা খান, জাহিদা খান ও মো. জিয়াউল হুদা খান।

শেষ জীবনে তিনি দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে ছিলেন। এ সময় তার নিয়মিত রুটিন ছিলো কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের পাশাপাশি কাসীদায়ে বুরদা পাঠ করা। মাঝে মাঝে বুখারী শরীফের খতমে শরীক হতেন। ২০০৩ সালে রামাদ্বান মাসে তিনি অসুস্থ হন এবং ২০০৮ সালের রামাদ্বান মাসে (১৫ রামাদ্বান) ইন্তিকাল করেন। ইন্তিকালের দিনও তিনি রোযা ছিলেন। নিজ বাড়ির সন্নিকটে সিরাজপুর পাঠানবাড়ি পারিবারিক গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

ব্যক্তিজীবনে মাওলানা আব্দুছ ছালাম খান (র.) অত্যন্ত নম্র হৃদয়ের অধিকারী ও বিনয়ী স্বভাবের ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ, ধৈর্যশীল ও পরোপকারী। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনের সাথে সর্বদা সদ্ভাব ছিলো। নিরবে-নিভৃতে তিনি গরীব আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। আল্লাহ তাঁর সকল নেক আমলকে কবূল করুন এবং জান্নাতে উচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

সূত্র: শতবর্ষপূর্তি স্মারক, বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ) মাদরাসা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *