সংবাদ

ম্যাক্রোঁর সেক্যুলারিজম ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অবমাননা : দায়ভার কার?

মারজান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী

সম্প্রতি ফ্রান্সে যা কিছু হচ্ছে, তা কারও অজানা নয়। আমাদের নবী সায়্যিদুনা মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রতি অবমাননাকর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনকারী এক শিক্ষকের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে মুসলমানদের প্রতি চরম বৈরি আচরণ প্রদর্শন করা হচ্ছে। যদিও পুলিশ ওই চেচনিয়ান যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে, তবুও ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে নির্বিচারে চলছে মুসলিম ধরপাকড়, বন্ধ করা হচ্ছে মসজিদ। সবচেয়ে ঘৃণ্য বিষয় হলো, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘোষণা অনুযায়ী গত বুধবার ফ্রান্সের সরকারি ভবনে শার্লি এবদোর তৈরি করা নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর একটি ব্যঙ্গচিত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে। সেক্যুলারিজমের জয়গান গাওয়া ফ্রান্স একটি হত্যাকে কেন্দ্র করে কিভাবে একটি পুরো জাতির প্রতি এরকম অগ্রহণযোগ্য আচরণ করতে পারে, প্রশ্নটি সবার মনে। দার্শনিক স্লেভজ যিজেক বলেছিলেন, “সেক্যুলারিজম সব জায়গায় সমান নয়।” বাস্তবেও আমরা দেখেছি, সেক্যুলারিজমের কত রঙ! ম্যাক্রোঁ এখন সেক্যুলারিজমের নতুন একটি সংস্করণ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন।

অবশ্য ম্যাক্রোঁর নব্য-সেক্যুলারিজম খুব অনন্য বা অভূতপূর্ব নয়। তাঁর পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক (১৯৯৫-২০০৭) ও নিকোলাস সারকোজি (২০০৭-২০১২) সেক্যুলারিজমের নাম ধরে মুসলিম-বিদ্বেষের কোনো কসরত বাকি রাখেননি। আজ যখন ফ্রান্স করোনাভাইরাস ও ২.৫৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল ঋণের বোঝায় (২০১৮ রিপোর্ট) পিষ্ট, তখন নিজেকে মধ্যপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করে ক্ষমতায় আসা ম্যাক্রোঁ গদি বাঁচাতে পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করছেন। দুনিয়ার যে প্রান্তে যারই ঝগড়া লাগুক, ম্যাক্রোঁ তাঁর সেক্যুলারিজম নিয়ে সেখানে ইসলাম-বিদ্বেষ প্রদর্শন করতে পৌঁছে যান। সম্প্রতি গ্রীস-তুরস্ক ও আজারবাইজান-আর্মেনিয়া দ্বন্দ্বে আমরা ম্যাক্রোঁকে খ্রিস্টান বিশ্বের ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে নাচতে দেখেছি। ম্যাক্রোঁ তাঁর নব্য সেক্যুলারিজমের সঙ্গী হিসেবে সাথে পেয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, বরিস জনসন, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে। নিরঙ্কুশ সমর্থন যুগিয়ে পাশে আছেন ভারতের নরেন্দ্র মোদি, সৌদির মুহাম্মদ বিন সালমান, আমিরাতের মুহাম্মদ বিন যায়েদ প্রমুখ। দল আজ ভারি, সুতরাং ম্যাক্রোঁ কেন সুযোগ নেবেন না?

বলা হয়, সেক্যুলারিজমের প্রথম শর্ত Freedom of Speech বা বাক স্বাধীনতা। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমেরিকায়, সেটি বুশের আমল হোক, ওবামার কিংবা ট্রাম্পের, কথার বলার যথেষ্ট স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু যাদেরকে নিয়ে আজ ম্যাক্রোঁ তাঁর নব্য-সেক্যুলারিজমের দলভারি করছেন, তাঁদের কাছে বাক স্বাধীনতার মূল্য কতটুকু, তা দেখার বিষয়। ভারতে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে সেটি রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল হয়ে যায়। নেতানিয়াহু বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে টু শব্দ করামাত্র এন্টি-সেমেটিজমের তকমা জুড়ে দেয়া হয়। আর মুহাম্মদ বিন সালমান? জামাল খাশুকজির নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা তো আমরা ভুলে যাইনি! আশ্চর্যজনকভাবে ম্যাক্রোঁ ও একই পথের অনুসারী। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান ম্যাক্রোঁর বিরুদ্ধে মন্তব্য করার কারণে ম্যাক্রোঁ আঙ্কারা থেকে তাঁর রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে এনেছেন। বাক স্বাধীনতা যদি এত মূল্যবান হয়, তাহলে ম্যাক্রোঁ কেন এরদোগানের ‘কটূকথা’ সইতে পারলেন না? নাকি ম্যাক্রোঁর কাছে বাক স্বাধীনতার অর্থ ‘বলব কিন্তু শুনব না’?

ওই শিক্ষককে হত্যা করা বেআইনি হয়েছে, তা আমরা নির্দ্বিধায় স্বীকার করি। মতভিন্নতার কারণে কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অবিবেচনাপ্রসূত এ অপরাধের মাধ্যমে ওই যুবক ফ্রান্সে বসবাসরত লাখো মুসলমানের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছেন। একইভাবে পুলিশ কর্তৃক ওই যুবককে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করাও সমর্থনযোগ্য নয়। যদি তর্ক সাপেক্ষে সেটিকে মেনেও নেই, তবু এর পরে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের নবী ﷺ-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করা একটি ঘৃণ্য মানসিকতার পরিচয়, যেখানে পৃথিবীর অন্তত দেড়শ’ কোটি মানুষের হৃদয় স্পন্দন এই ‘মুহাম্মদ’ নামের সাথে জড়িত। ম্যাক্রোঁর এ কাজটি সেক্যুলারিজম নয়; বরং কাজটি ছিল রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিজম।

খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের সাথে রাষ্ট্রব্যবস্থার দ্বন্দ্বের ফলে জন্ম নেয়া সেক্যুলারিজমের পতাকাবাহীরা আজ একাট্টা হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নেমেছেন। সেক্যুলারিজমের এ পথ-পরিবর্তনের দুটি কারণ রয়েছে।

প্রথমত, কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন যতদিন পর্যন্ত বহাল ছিল, ততদিন পশ্চিমা দুনিয়ার সামনে শত্রু হিসেবে ছিল ওরাই। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেক্যুলার পশ্চিমা বিশ্ব ‘শত্রুহারা’ হয়ে পড়ল। ট্রিলিয়ন ডলারের অস্ত্রের বাজারে দেখা দিল মন্দা। যেহেতু বড় কোনো যুদ্ধের আশঙ্কা নেই, তাই কেউ অস্ত্র কিনতেও আগ্রহী ছিল না। প্রয়োজন পড়ল নতুন শত্রু দাঁড় করানোর। ভেবেচিন্তে যে নতুন শত্রু দাঁড় করানো হলো, তার নাম ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজম বা মৌলবাদী ইসলাম। যারা ইসলামকে নিছক একটি প্রথাসিদ্ধ ধর্ম হিসেবে না দেখে একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে দেখে, তাঁদেরকে টার্গেট করা হলো। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে ইসলামি জীবনব্যবস্থার স্বরূপকে ভেঙ্গেচুরে নিজেদের মতো অপব্যাখ্যা করে ‘ইসলামিক টেররিজম’ নামক একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি তৈয়ার করা হলো। একবিংশ শতাব্দীর শুরু (২০০১) থেকে এ নাটক মঞ্চস্থ হতে লাগল। ফিলিস্তিন-কাশ্মীর তো ছিলই, একে একে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন- সবই War on Terror নামক নাটকের শিকার হতে লাগল। নাটকে নায়কের ভূমিকায় পশ্চিমা বিশ্ব তো ছিলই, খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতে নিয়ে আসা হলো আল কায়েদা, আইএস প্রমুখ ভাড়াটে অভিনেতাদেরকে। ফলাফলস্বরূপ চনমনে হয়ে উঠল অস্ত্রের বাজার। Strategic Studies Quarterly Summer 2020 এর তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকা ২০০২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০০ বিলিয়ন, অর্থাৎ ২০ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বহির্বিশ্বে বিক্রি করেছে। বাকি যুদ্ধবাজ দেশগুলোর বেচাকেনার কথা বাদই দিলাম।

সেক্যুলারিজমের পথ-পরিবর্তনের দ্বিতীয় কারণ হলো, মুসলিম বিশ্বের অনৈক্য ও নেতৃত্বের অযোগ্যতা। দীনের নামে দোকানদারি করতে করতে একদিকে মুসলিম বিশ্বের আলিম সমাজ সাধারণ মুসলমানদেরকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে বিভক্তির মাঝে ফেলে রেখেছেন, অপরদিকে মুসলিম উম্মাহ’র নেতৃত্ব প্রদান করার চেয়ে পশ্চিমাদের গোলামি করাকে অধিক ‘বরকতময়’ মনে করে আরব জাহানের মুসলিম নামধারী নেতারা সেক্যুলারিজমের ভ্যানচালক হয়ে বসে আছেন। আরব বিশ্ব ছাড়া বাকি মুসলিম দুনিয়ার নেতৃবৃন্দ মূলত ‘হাতপাতা’ মুসলমান। বেশিরভাগই বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের ভিক্ষা নিয়ে চলেন। তাই এদের কাছ থেকে তেমন কিছু আশাও করা যায় না। একদা পবিত্র কুরআনে যাদেরকে ‘উলুল আমর’ বা নেতৃত্বদানকারী বলা হয়েছিল, আজকের দিনে তাঁরা দীনি দিক থেকেও রিক্তহস্ত, দুনিয়াবি দিক থেকেও কপর্দকশূন্য।

ফ্রান্সে আমাদের নবী ﷺ-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। কোটি মুসলমানের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে, ব্যক্তিবিশেষে প্রতিবাদও হয়েছে। তবে ব্যক্তি কেবল প্রতিবাদ করতে পারে, প্রতিকার করতে পারে না। প্রতিকারের জন্য ঐক্য লাগে, একতা লাগে, শিক্ষা লাগে, সাহস লাগে, কৌশল লাগে, নেতৃত্ব লাগে… সবার আগে ঈমান লাগে। যখন পৃথিবীতে মুসলমানরা ছিল না, তখন কা’বা শরীফ ভাঙ্গতে আসা আবরাহার হস্তি বাহিনীকে আল্লাহ তা’আলা আবাবিল পাখি পাঠিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। আজ পৃথিবীতে মুসলমানরা আছে, তাই আজ কোনো আবরাহা কা’বা শরীফ ভাঙ্গতে কিংবা আমাদের নবীকে অপমান করতে উদ্যত হলে আল্লাহ আবাবিল পাখি পাঠাবেন না। আজ আমরাই আবাবিল পাখি, দায়িত্ব আমাদের। কিন্তু সে দায়িত্ব পালন করতে আমরা ব্যর্থ। আর এই ব্যর্থতার পুরো দায় আমাদের মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের। তাই ফ্রান্সে আমাদের নবীকে অপমান করার দায়ভার কেবল ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘাড়ে যাবে না। বরং সমপরিমাণ দায় বর্তাবে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে বসে থাকা নমরুদ-ফেরাউনদের ঘাড়ে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *