মনীষা

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (র) : মদীনার ফকীহ

ইমরান রাইহান

মদীনা। ৬৫ হিজরী।

হজ্বের সফরে এসেছেন খলিফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান। একদিন দুপুরে মসজিদে নববীর পাশে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। বাইরে প্রখর রোদ। উত্তপ্ত হয়ে গেছে পথঘাট। খলিফার চোখে ঘুম নেমে এলো। এ সময় মসজিদে নববীতে হৈচৈ শুরু হলে খলিফার ঘুম ভেঙ্গে যায়।
‘দেখো তো মসজিদে নতুন কোনো মুহাদ্দিস এসেছে কিনা?’ খলিফা একজন প্রহরীকে পাঠালেন মসজিদে কী হচ্ছে দেখে আসার জন্য।
প্রহরী মসজিদে এসে দেখলো একজন আলেম বসে তার ছাত্রদের দরস দিচ্ছেন। এছাড়া মসজিদে আর কেউ নেই। প্রহরী সেই আলেমের সামনে এসে দাঁড়াল। হাত দিয়ে ইশারা করলো আলেম যেন তার সাথে উঠে আসেন। প্রহরী একটু সামনে এগিয়ে দেখে আলেম আগের মতই দরস দিচ্ছেন। তিনি উঠে আসেননি। সে অবাক হয়ে ফিরে এলো।

‘আশ্চর্য। আপনাকে আমার সাথে যেতে বলেছি না?’ সে কিছুটা রাগী কন্ঠে বলে।
‘কেন যাব?’ আলেম নির্বিকার কন্ঠে বলেন।
‘আমিরুল মুমিনিন আপনাকে ডেকেছেন’ কন্ঠের তেজ একটুও না কমিয়ে বলে প্রহরী।
‘তিনি কি আমার নাম ধরে ডেকেছেন?’
‘না। তিনি বলেছেন দেখো মসজিদে নতুন কেউ এসেছে কিনা? আমি এখানে এসে আপনাকে ছাড়া আর কাউকে দেখিনি’
‘তাহলে তুমি যাও। আমি তার মুহাদ্দিসদের কেউ নই’ এই বলে আলেম আবার পড়ানোতে ব্যস্ত হলেন।

প্রহরী বিরক্ত হয়ে মনে মনে বললো, এই শায়খ মনে হয় পাগল। খলিফার ডাক শুনেও কেউ সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে কীভাবে তা প্রহরীর মাথায় ঢুকছিল না। তবে আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান কিন্তু ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন শায়খের এমন আচরণের কারণ।

প্রহরীর মুখে সব শুনে তিনি বললেন, ইনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবই হবেন। তাকে তার মতো থাকতে দাও।

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব। তাকে বলা হতো সাইয়্যিদুত তাবিয়িন বা তাবেঈদের সর্দার। বসবাস করতেন মদীনায়। সেখানকার মুফতি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। তবাকাতে ইবনে সাদে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদার আদালতের ফায়সালাগুলো সম্পর্কে তার চেয়ে বেশি জানতো না কেউ। তাকে বলা হতো ফকিহুল ফুকাহা, আলিমুল উলামা। ফকিহদের ফকিহ, আলেমদের আলেম। কুদামা বিন মুসা বলেন, সাহাবায়ে কেরাম জীবিত থাকা অবস্থাতেই সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ফতোয়া দিতেন।

উমর ইবনে আবদুল আযিয যখন মদীনার গভর্নর হয়ে এলেন তখন তিনিও সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের পরামর্শ ছাড়া কোনো ফয়সালা দিতেন না। অন্য আলেমরা উপস্থিত হতেন উমর ইবনে আবদুল আযিযের দরবারে, কিন্তু উমর ইবনে আবদুল আযিয স্বয়ং উপস্থিত হতেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কাছে। একবার একটি মাসআলা জানার জন্য তিনি লোক পাঠালেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কাছে। সেই লোক গিয়ে সাঈদকে ডেকে আনলো। উমর ইবেন আবদুল আযিয লজ্জিতকন্ঠে বললেন, সে ভুল করেছে। আমি আপনাকে ডাকতে বলিনি। আমি বলেছি আপনার কাছ থেকে মাসআলাটি জেনে আসতে।

এমনই বিরল সম্মানের অধিকারী ছিলেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব। ১৫ হিজরীতে মদীনায় তার জন্ম। সে সময় চলছিল হজরত উমর (রা) এর শাসন। বরেণ্য সাহাবিদের অনেকেই তখনো জীবিত। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব তাদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, তাদের ইলম থেকে উপকৃত হয়েছিলেন। বিশেষ করে তিনি হজরত উসমান, হজরত আলী, হজরত আবু হুরাইরা, হজরত আয়েশা সিদ্দিকা, হজরত আবু মুসা আশআরি, হজরত আবদুল্লাহ বিন উমর, হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস, হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর, হজরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, হজরত হাসসান বিন সাবিত (রা)দের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন।

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ছিলেন অসাধারণ মেধার অধিকারী। একবার যা শুনতেন হুবহু মুখস্থ হয়ে যেত। বছরের পর বছর পার হলেও তা ভুলতেন না। মেধার সাথে যখন পরিশ্রম একত্র হয় তখন যে ফলাফল আসে তা যে কাউকে বিস্মিত করে। হজরত সাঈদের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছিল। একদিকে তিনি ছিলেন মেধাবী, অন্যদিকে ছিলেন ইলমের জন্য নিবেদিত। ফলে অল্পদিনেই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। একজন যোগ্য আলেম হিসেবে সবাই তাকে স্বীকৃতি দেন।

বনু উমাইয়ার শাসনের সূচনা হয় ৪০ হিজরীতে, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের বয়স তখন ২৫ বছর। একদিকে তিনি খোলাফায়ে রাশেদার তিনজন খলিফার শাসন পেয়েছিলেন, আবার বনু উমাইয়ার শাসনেও অনেক খলিফার শাসনকাল পেয়েছেন। একজন খ্যাতিমান আলেম হিসেবে বরাবরই তিনি ছিলেন শাসকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তারা বারবার তার কাছাকাছি হওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তিনি কখনোই সাড়া দেননি। তার নামে বাইতুল মাল থেকে যে ভাতা বরাদ্দ ছিল তাও গ্রহণ করেননি কখনো। তাকে এ বিষয়ে বলা হলে তিনি জবাব দিতেন, আমার এ ভাতার দরকার নেই।

ইয়াযিদের আমলে হাররার ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে। এ সময় মুসলিম বিন উকবার বাহিনী ইয়াযিদের বাইয়াত প্রতিষ্ঠা করার জন্য মদীনা আক্রমন করে। সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ের পর তারা যখন শহরে প্রবেশ করে তখন শুরু হয় হত্যা ও লুন্ঠন। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবও এ সময় বন্দী হন। সম্ভবত তাকে হত্যা করা হত, কিন্তু মদীনার লোকজন তার পক্ষে সুপারিশ করে বলে, এই লোক পাগল তাকে ছেড়ে দাও।

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব মুক্তি পান, কিন্তু তার স্মৃতি থেকে এই দুঃসহ ঘটনা মুছে যায়নি। শাসকদের ব্যাপারে তার নেতিবাচক ধারণারও পরিবর্তন হয়নি। বিশেষ করে বনু উমাইয়ার শাসকদের সাথে তার ছিল বেশ দূরত্ব। আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান যখন তার ছেলে ওয়ালিদের জন্য অলি আহদের বাইয়াত নেন তখন সাঈদ বাইয়াত দিতে অস্বীকৃতি জানান। তার মতে একই সময়ে দুইজনের কাছে বাইয়াত দেয়া জায়েজ নয়। তখন মদীনায় উমাইয়াদের নিযুক্ত গভর্নর ছিলেন হিশাম বিন ঈসমাইল। তিনি বারবার সাঈদকে বলেন, আপনি বাইয়াত দিন। কিন্তু সাঈদ নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন।

শেষে হিশাম বলেন, তাহলে এক কাজ করুন আপনি এই ঘরে প্রবেশ করে আবার বের হয়ে যান। তাহলে বাইরে যারা আছে তাদেরকে আমরা বলতে পারবো, আপনি বাইয়াত দিয়েছেন।

সাঈদ বলেন, আমি এভাবে কোনো মানুষকে ধোঁকা দিতে পারবো না।
একথা শুনে ক্ষিপ্ত হিশাম তাকে চাবুক মারার আদেশ দেন এবং তার দরসে বসাও নিষিদ্ধ করেন। আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান এই কথা শুনে দ্রুত পত্র লিখে হিশামকে বলেন, তাকে কোনো শাস্তি দেয়া থেকে বিরত থাকো। একই সময় তিনি আরেকটি পত্র লিখেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কাছে। সেই পত্রে তিনি জানান শাস্তি দেয়ার বিষয়টি হিশামের বাড়াবাড়ি। খলিফার পক্ষ থেকে তাকে এমন কোনো আদেশ দেয়া হয়নি।
পত্র পড়ে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব মন্তব্য করেন, আমার এবং জালেমদের মাঝে আল্লাহ ফায়সালা করে দিবেন।

বন্ধুদের অনেকে সাইদকে বলতেন, আপনি বনু উমাইয়ার জন্য বদদোয়া করুন। জবাবে সাঈদ শুধু এটুকুই বলতেন, আল্লাহ আপনি আপনার দ্বীনকে সম্মানিত করুন। আপনার নেক বান্দাদের বিজয়ী করুন।
তিনি প্রায়ই বলতেন, জালেমের সঙ্গীদের দেখলে তাদেরকে মন থেকে খারাপ ভাবো। নইলে হয়তো তোমাদের নেক আমল কেড়ে নেয়া হতে পারে।

একবার আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান এসেছিলেন সাঈদের সাথে দেখা করতে। মসজিদের নববীর দরজার দাঁড়িয়ে তিনি লোক পাঠালেন ভেতরে। বললেন, সাঈদকে ডেকে আনো, তবে তাকে কোনো কষ্ট দিয়ো না।

খলিফার লোক ভেতরে এসে বললো, আমিরুল মুমিনিন মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আপনার সাথে কথা বলতে চান।
‘আমিরুল মুমিনিনের কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার কাছেও তার কোনো প্রয়োজন নেই’ সাঈদ শক্ত কন্ঠে জবাব দিলেন।
খলিফাকে বলা হলো সাঈদ কী বলেছেন। ‘আবার তার কাছে যাও। তাকে কোনো কষ্ট না দিয়ে বলো, আমি তার সাথে কথা বলতে চাই’ বললেন খলিফা।

খলিফার দূত আবারও এলো সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের সামনে। আবারও বলা হলো, আপনাকে আমিরুল মুমিনিন ডাকছেন। সাঈদ আগের মত একই জবাব দিলেন। এবার দূত রেগে বললো, আমিরুল মুমিনিন যদি আপনাকে কষ্ট দিতে নিষেধ না করতেন, তাহলে এখন আপনার মাথা কেটে নিয়ে যেতাম। আমিরুল মুমিনিন আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন, আর আপনি প্রতিবার এমন করছেন।

‘তিনি যদি আমার সাথে ভাল আচরণের ইচ্ছা করেন তাহলে এটা তোমার জন্য উত্তম। যদি তিনি এর অন্যথা করতে চান তাহলে করে ফেলুন। আমি প্রস্তুত’ বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে জবাব দিলেন সাঈদ।

আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান যখন সাঈদের এই কথা শুনেন তখন তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন হে আবু মুহাম্মদ। আপনি ইস্তিকামাতকেই বেছে নিলেন।

তবে এতকিছুর পরেও আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান ছিলেন সাঈদের প্রতি ইতিবাচক। এমনকি তিনি তার ছেলে ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের মেয়ের সাথে। শোনামাত্র এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সাঈদ।

নিজের মেয়েকে তিনি বিবাহ দিয়েছিলেন ছাত্র আবু ওয়াদাআর সাথে। আবু ওয়াদাআ পরে শুনিয়েছেন এই বিয়ের গল্প। চলুন তার মুখেই শোনা যাক। আবু ওয়াদাআ বলেন,

আমি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের দরসে বসতাম। একবার আমি কদিন অনুপস্থিত থাকি। পরে উপস্থিত হলে সাঈদ প্রশ্ন করেন

‘এ কদিন কোথায় ছিলে?’
‘আমার স্ত্রী মারা গেছে। কাফন দাফনে ব্যস্ত ছিলাম’ জবাব দিলাম।
‘আমাকে জানাতে। জানাযায় উপস্থিত হতাম’
একটু পর তিনি আবার প্রশ্ন করেন,
‘এখন বিয়ে করবে ?’
‘কে আমাকে মেয়ে দিবে? আমার কাছে তো মোহরের সামর্থ্য নেই’
‘কত আছে?’
‘দুই বা তিন দেরহাম”
সাঈদ বললেন, ‘আমার মেয়েকে বিয়ে দিতে চাই’। এরপর সে মজলিসেই তিনি তার মেয়ের সাথে আমাকে বিয়ে দেন। আমি আনন্দিত মনে ঘরে ফিরে আসি।

আমি ছিলাম রোজাদার। ইফতারির সময় দরজায় করাঘাত হলো।

‘কে?’ জানতে চাইলাম।
‘সাঈদ ’ জবাব এল।

ভাবতে থাকি কে হতে পারে। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বাদে আর সবার কথা মাথায় এলো। সাঈদ আসবেন না এটা নিশ্চিত, কারন গত ৪০ বছর ধরে তিনি ঘর থেকে মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যান না। দরজা খুলে দেখি সামনে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব দাঁড়িয়ে আছেন।
‘আপনি কষ্ট করে এলেন? আমাকে ডেকে পাঠালেই তো হতো’ বিস্ময় সামলে বললাম।
‘না, আমারই আসতে হতো। তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করেছো। আজ রাতে তুমি একা থাকবে, ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে নি। তোমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি’ এই বলে সাঈদ সরে দাড়ালেন। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন আমার স্ত্রী। সাঈদ তার মেয়েকে হাত ধরে আমার ঘরের ভেতর নিয়ে এলেন। তারপর তিনি বিদায় নিলেন। আমার স্ত্রী ঘরে প্রবেশ করে লজ্জায় এক কোনে চলে গেলেন। আমি বিষয়টি বুঝতে পেরে প্রদীপের উপর পেয়ালা রেখে দিলাম, যেন অন্ধকার হয়ে যায় এবং তিনি অস্বস্তিবোধ না করেন।

এই হলো আমার বিয়ের ঘটনা।

আমার সৌভাগ্য আমি এমন স্ত্রী পেয়েছি যিনি হাফেজা এবং হাদীস শাস্ত্রেও পারদর্শী। সৌন্দর্যেও অতুলনীয়া। আলহামদুলিল্লাহ। বিয়ের পর এক মাস আমি বাড়িতেই ছিলাম। দরসে যাইনি। এক মাস পর যখন দরসে গেলাম সাঈদ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তাকে কেমন পেয়েছ? আমি জবাব দিলাম, অন্তর প্রশান্তকারী। তিনি দিল জিতে নিয়েছেন। আমি ফিরে আসার সময় সাইদ আমাকে ২০ হাজার দিরহাম হাদিয়া দেন।

ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক যখন ক্ষমতায় বসেন একবার তিনি মদীনায় এলেন। মসজিদে নববীর সামনে এসে দেখলেন ভেতরে কেউ একজন দরস দিচ্ছেন।

‘ইনি কে?’ জিজ্ঞেস করেন ওয়ালিদ।
‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব’ জবাব দেয় পাশ থেকে একজন।
‘তাকে ডেকে আনো’ আদেশ দেয় ওয়ালিদ।
সাঈদকে যখন বলা হলো খলিফা আপনাকে ডেকেছেন, তিনি বললেন, সম্ভবত তিনি অন্য কাউকে ডেকেছেন তোমরা ভুল করেছ।

একথা শুনে ওয়ালিদ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে শাস্তি দিতে চায়। কিন্তু উপস্থিতরা তাকে থামায় এই বলে, আমিরুল মুমিনিন, ইনি মদিনার মুফতি, কুরাইশের সর্দার, আপনার পিতার বন্ধু। এর আগেও কোনো শাসক তাকে নিজ দরবারে উপস্থিত করাতে পারেনি।

এই কথা শুনে ওয়ালিদ শান্ত হন।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সাক্বাফি। উমাইয়াদের এই গভর্নর নিজের জুলুমের কারণে ইতিহাসের এক অন্ধকার কোনে নিজের স্থান করে নিয়েছে। ইমাম যাহাবীর মত সচেতন ঐতিহাসিক তার সম্পর্কে বলেছেন, তার ভালো কাজগুলো ডুবে গেছে তার অপরাধের সমুদ্রে।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন উম্মাহর আলেমদের একাংশ। তবে সাঈদ ছিলেন এ থেকে নিরাপদ। একবার তাকে প্রশ্ন করা হয় হাজ্জাজ আপনাকে কিছু বলে না কেন? তিনি জবাব দেন, এর কারণ আমার জানা নেই। তবে একবার হাজ্জাজ তার পিতাসহ মসজিদে নামাজ পড়তে এসেছিল। আমি দেখলাম তার রুকু সেজদা ঠিকমত হচ্ছে না। আমি তাকে সতর্ক করার জন্য এক মুঠো কংকর নিক্ষেপ করি তার দিকে। সেই থেকে তার নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়।

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব স্বপ্নের ব্যখ্যা দেয়ার ক্ষেত্রেও ছিলেন পারদর্শী। তিনি এই শাস্ত্র শিখেছিলেন হজরত আসমা বিনতে আবু বকরের কাছে। এক ব্যক্তি সাঈদকে এসে বলে, আমি স্বপ্নে দেখেছি আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানকে আমি মাটিতে শুইয়ে ফেলেছই এবং তার পিঠে চারটি কাঠ গুজে দিয়েছি। সাঈদ বললেন, এই স্বপ্ন তোমার নয়। স্বপ্ন কে দেখেছে তার নাম বলো। নইলে ব্যখ্যা করবো না। লোকটি বললো, এই স্বপ্ন দেখেছেন আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর। সাঈদ বললেন, এর ব্যাখ্যা হলো, আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইরকে আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান হত্যা করবে। এরপর তার চার ছেলে খলিফা হবে।

পরে এমনটিই হয়েছিল।

ইলমের পাশাপাশি ইবাদতের ক্ষেত্রেও সাঈদ ছিলেন এগিয়ে। টানা ৪০ বছর তিনি জামাতে নামাজ আদায় করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন ত্রিশ বছর ধরে আমি আজানের আগেই মসজিদে এসেছি।

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ইন্তেকাল করেন ৯৪ হিজরীতে। মৃত্যুর আগে বেশকিছুদিন তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি অসিয়ত করেন, আমার মৃত্যুর এলান করার দরকার নেই। আমাকে আমার রবের কাছে পৌঁছে দিতে চারজন ব্যক্তিই যথেষ্ট। আমার কাফন দাফন দ্রুত দিবে। আমার বিরহে কান্না করছে এমন কাউকে আমার জানাজার সাথে আসতে দিবে না।

(সিয়ারু আলামিন নুবালা, তবাকাতে ইবনে সাদ ও হিলয়াতুল আউলিয়া থেকে সংক্ষেপিত)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *